Homeদক্ষিণ এশিয়াকংগ্রেস থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি

কংগ্রেস থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি

-

সাম্প্রদায়িক প্রশ্নের সমাধান হিসেবে ১৯৪৭ সালে ভারতের বিভক্তি ভারতের ইতিহাসে একটি মস্ত বড় ট্র্যাজেডি, কিন্তু কংগ্রেসের শাসনামলে ভারতে সাম্প্রদায়িকতা টিকে থাকে এবং পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি ঘটে এবং সাম্প্রদায়িকতা হিন্দুত্ববাদ হিসেবে নতুন রূপ নেয়। এভাবে ভারত এখন হিন্দুত্ববাদী বিজেপির শাসনাধীন হয়েছে এবং সাম্প্রদায়িকতা একটি দানবের রূপ ধারণ করেছে। এই পরিণতির কারণ বুঝতে হলে ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

জেমস মিল ছিলেন একজন বড় মাপের পণ্ডিত এবং ভারতের প্রথম ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ। তাঁর গ্রন্থ দ্য হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া-তে তিনি ভারতের ইতিহাসকে হিন্দু, মুসলিম এবং ব্রিটিশ কালপর্বে ভাগ করেছেন। প্রথম দুই কালপর্বকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছিল। কিন্তু তৃতীয় পর্বকে খ্রিস্টীয় আমল বলার পরিবর্তে ব্রিটিশ আমল হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ভারতীয়দের মধ্যে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক মনোভাব সৃষ্টির অসৎ উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে এটি করা হয়েছিল।

ধর্মের ভিত্তিতে এই বিভাজনও করা হয়েছিল ভুলভাবে। ভারতীয় ইতিহাসের পুরো প্রাক-সুলতানী আমলকে বিকৃত করে হিন্দু শাসনকাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এই মিথ্যাচার ছিল ইচ্ছাকৃত। কেননা সেই কালপর্বে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী অশোক, কণিষ্ক, হর্ষবর্ধন এবং পালদের মতো সম্রাট এবং রাজারাও ভারত শাসন করেছিলেন, যাঁরা চার শত বছর পূর্ব ভারত শাসন করেছিলেন। এছাড়াও আরো অনেক গৌণ বৌদ্ধ রাজা ছিলেন। সুলতানী ও মোগল আমলের সকল রাজা ও সম্রাটকে হিন্দু-নির্যাতক ও হিন্দু ধর্মের শত্রু হিসেবে চিত্রিত করা হয়। তাঁর আক্রমণের বিশেষ লক্ষ্যবস্তু ছিল মোগলরা। জেমস মিলের মৃত্যু হয় ১৮৩৬ সালে, কিন্তু তাঁর ইতিহাস বিষয়ক লেখা পরবর্তী ইতিহাস-রচয়িতাদের প্রভাবিত করেছিল। আর.সি. দত্ত, আর.সি. মজুমদার, যদুনাথ সরকার এবং অন্যান্য ভারতীয় ইতিহাসবিদগণ জেমস মিল নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে ইতিহাস রচনা করেছেন এবং ইতিহাসের সাম্প্রদায়িকীকরণ করেছেন। এই সাম্প্রদায়িক ইতিহাসবিদগণ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতের রাজনীতিকে বহুলাংশে রূপদান করেছিলেন।

ব্রিটিশ সরকার বিশেষ করে মোগলদেরকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করে এবং এটা দেখাতে চায় যে, ব্রিটিশের শাসন হিন্দুদের জন্য ছিল কল্যাণকর। ১৮৫৭ সালে হিন্দু ও মুসলমান উভয়ই ঐক্যবদ্ধভাবে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং শেষ মোগল সম্রাট বাহাদূর শাহকে সম্রাট ঘোষণা করে। সেই অভ্যুত্থানে বাহাদূর শাহ এর কোন সক্রিয় ভূমিকা ছিল না, কিন্তু তিনি এবং মুসলমানরা ব্রিটিশদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামারস্টোন দিল্লীতে অবস্থিত সকল মোগল স্থাপনা ধ্বংসের নির্দেশ দেন। উইলিয়াম ডালরিম্পল সেই সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে যেয়ে তাঁর The City of Djinns বইতে লিখেছেন,

“The recapture of Delhi by the British on 14 September 1857 led to the wholesale destruction of great areas of the city. The Red Fort was plundered and much of it razed to the ground; what remained of one of the most beautiful palaces became a gray British barracks. It was only by a hair’s-breadth that the great Mughal Jama Masjid was saved from similar destruction. … Three thousand Delhi-wallahs were tried and executed—either hanged, shot or blown from the mouths of cannons.…. The last Emperor was sent off to exile in Rangoon in a bullock cart; the princes, his children, were all shot. The inhabitants of the city were turned out of the gates to starve in the countryside outside; and even after the city’s Hindus were allowed to return, Muslims remained banned for two whole years. The finest mosques were sold off to Hindu bankers for use as bakeries and stables.”

বাস্তবিকই পুরনো দিল্লীর শাহজাহানাবাদে অবস্থিত সকল মোগল স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছিল। মোগল আমীর এবং সেনাপতিদের বিশাল প্রাসাদ এবং দালান, বিশাল চাঁদনী চক বাজার, শাজাহানের কন্যা জাহানারা নির্মিত দৃষ্টিনন্দন অতিথিশালা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই কাজটি আফগানিস্তানের বামিয়ানে অবস্থিত বুদ্ধ মূর্তি ধ্বংসের থেকে কোন অংশে কম বর্বর কাজ ছিল না। ইতিহাসবিদরা এর কোন সমালোচনা করেন নি, তাঁরা নিরবতা পালন করেছেন। এই পুরো ঘটনাকে ভুলে যেতে দেওয়া হয়েছে।

ব্রিটিশপূর্ব যুগে মুসলমানরা মোগল সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনে নিয়োগ পেতেন। মুসলমানদের মধ্যে অল্প সংখ্যক ভূমি মালিক ছিলেন। কিছু হিন্দুরাও সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনে নিযুক্ত ছিলেন, কিন্তু ভূসম্পত্তি এবং জমিদারীর বেশিরভাগই ছিল তাঁদের। মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর মুসলমানরা সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনে চাকরি হারায় এবং তাদের কোন বিকল্প কর্মসংস্থান ছিল না। তারা ব্রিটিশ শাসনের প্রতি বিরূপ ছিল এবং ব্রিটিশ মালিকানাধীন কোন ব্যবসা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাজে অংশগ্রহণ করত না। অপরপক্ষে হিন্দুরা তাদের সামনে অবারিত সুযোগকে স্বাগত জানায় এবং তার সদ্ব্যবহার করে। তাদেরকে ব্রিটিশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়া হয় এবং তারা মুৎসুদ্দী, বেনিয়া, মহাজন হিসেবে এবং অন্যান্য কাজেও নিয়োজিত হন।

ঔপনিবেশিক প্রশাসন একটি নতুন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে এবং স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করে যেখানে ইংরেজী শিক্ষা প্রদান করা হয়। হিন্দুরা এর পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে এবং শিক্ষায় এগিয়ে যায়। সরকারী দপ্তরে এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে যা তাদেরকে সাহায্য করেছিল। মুসলমানরা সাধারণভাবে এই সুযোগ গ্রহণ করা থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে এবং তাদের মধ্য থেকে খুব কম সংখ্যকই ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ করে। এসবের ফলস্বরূপ, মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় শিক্ষায় এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। তারা দরিদ্র এবং অশিক্ষিত রয়ে যায়। এইভাবে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল এবং শিক্ষায় অগ্রসর হিন্দুদের সাথে দরিদ্র এবং পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের একটি দূরত্ব তৈরী হয়। এই দূরত্ব ঊনিশ শতকে আরও বৃদ্ধি পায় এবং ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতিতে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ধারক উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়।

ভূমি মালিকানা এবং জমিদারীর ক্ষেত্রেও মুসলমানরা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিধান অনুসারে জমিদারদের আদায়কৃত খাজনার নয়-দশমাংশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারকে প্রদান করতে হত। বেশীর ভাগ জমিদার নির্ধারিত খাজনা প্রদানে ব্যর্থ হয় এবং তাদের জমিদারী নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। নিলামকৃত জমিদারীগুলি কলকাতাভিত্তিক মুৎসুদ্দী, বেনিয়া, বণিক এবং কুসীদজীবীরা ক্রয় করত, যাদের হাতে থাকত নগদ অর্থ। মুসলমানদের হাতে কোন অর্থ ছিল না এবং অল্প কিছু বাদে সকল জমিদারী হিন্দুদের একটি নতুন শ্রেণীর হাতে চলে যায়। এই অসমতা ঊনিশ শতকে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং শতাব্দীর শেষের দিকে তা এক সংকটজনক পর্যায়ে উপনীত হয়।

হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে ব্যবধান হ্রাস সমগ্র ভারতের মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বাঙলায় এটা এক আন্দোলনে রূপ নেয়। পূর্ববঙ্গের কিছু প্রভাবশালী নেতা এবং মুসলমান মধ্যশ্রেণীর একটি অংশ বাঙলাকে বিভক্ত করে একটি পৃথক প্রদেশ গঠনের দাবী করেন। দৃশ্যতঃ প্রশাসনিক কারণে ব্রিটিশ সরকারের বাঙলা বিভাজনের সিদ্ধান্তের সাথে এই দাবি কার্যত মিলে যায়। এটা ঠিক যে, বাঙলা প্রেসিডেন্সির বিশাল আকারের কারণে এর পূনর্গঠন করার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করাও তাদের মতলবে ছিল। এই উদ্দেশ্যে তারা নবাব সলিমুল্লাহ্র মতো পূর্ববঙ্গের বিভাজনকামীদেরকে অনুপ্রাণিত এবং উৎসাহিত করেছিল। হিন্দু ও মুসলমানের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য মুসলিম অধ্যুষিত একটি পৃথক প্রাদেশিক প্রশাসনের অধীনে ক্রমশ হ্রাস পাবে বলে অনুমান করা হয়েছিল।

বঙ্গভঙ্গ হয়েছিল ১৯০৫ সালে, লাহোর প্রস্তাবের পঁয়ত্রিশ বছর আগে। বাঙলার উচ্চবর্ণভুক্ত হিন্দুরা ̶ জমিদার ও ভূমি মালিক, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, সরকারী ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মী, এবং রাজনৈতিক নেতারা ̶ সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছিলেন এবং বিভাজন বাতিলের দাবী করেছিলেন। প্রতিরোধ আন্দোলন খুব শক্তিশালী রূপ ধারণ করে এবং একই সাথে তা হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে। এই প্রতিরোধের মুখে এবং তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফলভাবে অর্জনের পর, ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ বাতিল করে।

এই প্রসঙ্গে লক্ষণীয় ব্যাপার যে, হিন্দু-মুসলিম বৈষম্যের প্রশ্নটি একটি জীবন্ত রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে চলে আসা সত্ত্বেও, কংগ্রেস দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণে মুসলমানদের যে কোন ছাড়ের বিরুদ্ধে অনড় ছিল। খেলাফত আন্দোলনে গান্ধীর সমর্থন প্রদান সত্ত্বেও এটি ছিল।

ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে খেলাফত আন্দোলন ছিল একটি নাম মাত্র ধর্মীয় আন্দোলন এবং এর কোন প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চরিত্র ছিল না। ভারতীয় মুসলমানদের দূর্দশার সাথে এর কোন সম্পর্ক ছিল না এবং এটি হিন্দুদের স্বার্থকে আঘাত করে নি। গান্ধী এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন। বাল গঙ্গাধর তিলকও এতে তাঁর সমর্থন দেন। গান্ধী খেলাফত আন্দোলনকে সহযোগিতা করার জন্য ২৩ কোটি ভারতীয় হিন্দুকে আহ্বান জানান। একই সাথে তিনি তাঁর অসহযোগ আন্দোলনও শুরু করেন। কিন্তু এই ধরনের আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। খেলাফত আন্দোলন শেষ হওয়ার পর হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

জিন্নাহ্ ছিলেন একজন ধর্মবিযুক্ত (secular) রাজনীতিবিদ। তিনি খেলাফত আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন এবং মুসলিম লীগকে এতে যোগদানে বাধা প্রদানের চেষ্টা করেন। কিন্তু মুসলিম লীগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। জিন্নাহ্ মুসলিম লীগের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ইংল্যান্ড চলে যান, যেখানে তিনি আইন পেশায় যোগ দেন।

বাঙলায় বৈষম্য একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয় এবং বেঙ্গল কংগ্রেসের চিত্তরঞ্জন দাস ফজলুল হক ও অন্যান্য মুসলমান নেতাদের সহযোগিতায় হিন্দু-মুসলিম বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য একটি দলিল তৈরী করেন। ১৯২৩ সালে তাঁরা ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ নামে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যেখানে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি দুই সম্প্রদায়ের জন্য সমান (৫০:৫০) চাকরির বিধান ছিল। একই সময়ে চিত্তরঞ্জন ঘোষণা করেন যে, কংগ্রেস বাঙলায় সরকার গঠন করলে মুসলমানদের জন্য ৬০ শতাংশ চাকরী সংরক্ষণ করবে যতদিন না হিন্দু ও মুসলমান এক্ষেত্রে সমান স্তরে পৌঁছায়। এই লক্ষ্যে কলকাতা কর্পোরেশনে মুসলমানদের জন্য ৮০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের পক্ষে তিনি মত প্রকাশ করেন। কংগ্রেসের কিছু সংখ্যক হিন্দু সদস্য চিত্তরঞ্জনের বিরুদ্ধে হৈ চৈ শুরু করেন এবং গান্ধী তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর অল্পদিন পরেই ১৯২৫ সালে চিত্তরঞ্জনের জীবনাবসান হয়।

১৯২৭ সালের ৮ই নভেম্বর ব্রিটিশ সরকার স্যার জন সাইমন এর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি পার্লামেন্টারী কমিশন ঘোষণা করে। কমিশনে কোন ভারতীয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ উভয় দলই এই কমিশন বয়কট করে। সায়মন কমিশন গঠনের ঘোষণার পর কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি ১৯২৮ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারী এক সর্বদলীয় সম্মেলনের আয়োজন করে। সেই সম্মেলনে বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধানের প্রধান দিকগুলো নির্ধারণ করার লক্ষ্যে মতিলাল নেহরুর সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ১৯২৮ সালের ২০শে ডিসেম্বর কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের যৌথ সম্মেলনে এবং কলকাতায় অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সম্মেলনে নেহরু কমিটির রিপোর্ট পেশ করা হয়।

সেই রিপোর্টে ভারতের জন্য একটি ডমিনিয়নের মর্যাদা, যৌথ নির্বাচকমণ্ডলী (joint electorate) কর্তৃক কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচন, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যালঘুদের জন্য আসন সংরক্ষণ, পাঞ্জাব ও বাঙলায় মুসলমানদের জন্য কোন আসন সংরক্ষিত না রাখা, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন সংরক্ষণ ইত্যাদির সুপারিশ করা হয়।

এই রিপোর্টের ওপর আলোচনা করার পর, জিন্নাহ্ কিছু সংশোধনী প্রস্তাব করেন যার মধ্যে কেন্দ্রীয় পরিষদে মুসলমানদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ, প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন চালু না হওয়া পর্যন্ত জনসংখ্যার ভিত্তিতে পাঞ্জাব এবং বাঙলায় মুসলমানদের জন্য আসন সংরক্ষণ, প্রাদেশিক বিষয়ে প্রদেশের হাতে ক্ষমতা অর্পণ ইত্যাদির প্রস্তাব করেন। তেজ বাহাদূর সপ্রু সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য বজায় রাখতে জিন্নাহ্ এই প্রস্তাব মেনে নেওয়ার জন্য আহ্বান জানান। কিন্তু হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধি জয়কর এবং মতিলাল নেহরু জিন্নাহ্ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। এই বিতর্কে গান্ধী কোন অংশগ্রহণ করেন নি এবং পুরোটা সময় নিরবতা পালন করেন। জিন্নাহ সংশোধনী ভোটে দেওয়া হলে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। এই পরাজয় জিন্নাহকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছিল। তাঁর কাছে এটি ছিল ‘হিন্দু ও মুসলমানের পথ আলাদা হয়ে যাওয়া’। এরপর থেকে তিনি হিন্দু-মুসলমান ঐক্য এবং বোঝাপড়ার সকল প্রচেষ্টা ত্যাগ করেন এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাঠামোর মধ্যে মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও সুরক্ষিত করায় মনোনিবেশ করেন। বুর্জোয়া রাজনীতির কাঠামোর মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষিত ও সংরক্ষণের জন্য এটি ছিল স্বাভাবিক এবং সহজতম পথ।

এই সর্বদলীয় সম্মেলন ছিল ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এতে জিন্নাহ্ ধর্মবিযুক্ততা (secularism) ভেঙে পড়ার সাথে সাথে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিচ্ছেদ দেখা দেয়। জিন্নাহ্ ভেঙে পড়াটা ছিল ভারতের সাংবিধানিক রাজনীতিতে ধর্মবিযুক্ত রাজনীতির ভাঙনের প্রতীক।

কংগ্রেসের কাছ থেকে মুসলমানদের কিছুই পাওয়ার নেই এটা নিশ্চিত হওয়ার পর জিন্নাহ্ সাম্প্রদায়িক পথ অবলম্বন করেন। তাঁর কাছে মুসলমানরা ছিল ভারতে একমাত্র সংখ্যালঘু যারা গুরুত্বপূর্ণ এবং কংগ্রেসকে মোকাবেলা করার জন্য তাদেরকে সংগঠিত করতে হবে। তাঁর ছিল নিজ বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থ, ছিল না কোন প্রসারিত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী এবং দূরদৃষ্টি। তা না হলে তিনি এটা উপলব্ধি করতেন যে, কংগ্রেসের হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা মোকাবেলার একটি অনেক বেশী কার্যকরী উপায় ছিল অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি এবং জাতিগত সংখ্যালঘু যেমন তফসিলি হিন্দু সম্প্রদায় (Scheduled Caste), শিখ, উত্তর-পূর্ব ভারতের জাতিসত্তা ইত্যাদির সাথে উষ্ণ এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক স্থাপন করা। সেই রকম একটি জাতীয় ঐক্য বৃহৎ হিন্দু পুঁজির ক্ষমতা খর্ব এবং ভারতে সংখ্যালঘু প্রশ্নের একটি গণতান্ত্রিক সমাধানের পথ সুগম করত।

ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে আলোচনার জন্য একটি গোল টেবিল সম্মেলন ডাকে। প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় লন্ডনে ১৯৩০ সালে এবং তারপর আরও দুটো অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। নিপীড়িত ও প্রান্তিক তফসিলি হিন্দুদের নেতা বি. আর. আম্বেদকর অস্পৃশ্যদের জন্য পৃথক আসনে নির্বাচনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। কিন্তু নিজেকে অস্পৃশ্যদের নেতা ও প্রকৃত প্রতিনিধি ঘোষণা করে গান্ধী আম্বেদকরের পৃথক নির্বাচনের দাবী এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে, এতে হিন্দুদের সংখ্যাগুরুর অবস্থা বহুলাংশে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এ ধরনের পরিবর্তনে ভীত হয়ে তিনি পরবর্তী পর্যায়ে তফশিলী হিন্দুদের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং তাদেরকে ‘হরিজন’ অথবা ঈশ্বরের লোক বলে নতুন নামকরণ করেন। তিনি হরিজন নামে একটি সংবাদপত্রও প্রকাশ করেন। এটা নিঃসন্দেহে ছিল একটি ভাঁওতাপূর্ণ অবস্থান। কারণ গান্ধী উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের স্বার্থে পুরোপুরি নিবেদিত ছিলেন।

গোল টেবিল সম্মেলনের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র‍্যামসে ম্যাকডোনাল্ড ঘোষণা করেন যে, অস্পৃশ্যরা ২০ বছরের জন্য পৃথক নির্বাচনের সুযোগ পাবে। এই সময় গান্ধী পুনা’র ইয়েরাওয়াড়া জেলে আটক ছিলেন। সেখান থেকে তিনি ঘোষণা করেন যে, অস্পৃশ্যদের জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা বাতিল করা না হলে তিনি আমৃত্যু অনশন করবেন।

এর এক মাস পর তিনি সত্যিই তাঁর অনশন শুরু করেন। সাথে সাথে শুরু হলো প্রবল উন্মাদনা। আম্বেদকরকে এই অনশনের জন্য দায়ী এবং গান্ধীকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলো। তিনি অত্যন্ত অসুবিধাজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়লেন। যুক্তি ও বিচারের পরিস্থিতি তখন ছিল না। আম্বেদকর গান্ধীর মৃত্যুর জন্য দায়ী হতে চান নি। তিনি অস্পৃশ্যদের জন্য তাঁর পৃথক নির্বাচনের দাবী প্রত্যাহার করেন এবং সংরক্ষণের বিষয়টি মেনে নেন। অনশন শুরুর চার দিন পর, ১৯৩২ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর আম্বেদকর জেলে গান্ধীর সাথে দেখা করেন এবং একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যা ‘পুনা চুক্তি’ নামে পরিচিতি পায়। অন্যান্য স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে ছিলেন গান্ধীর পৃষ্ঠপোষক, মাড়োয়াড়ী শিল্পপতি জি.ডি. বিড়লা এবং হিন্দু মহাসভার সভাপতি ভি.ডি. সাভারকর। এইভাবে গান্ধী অবশেষে তফসিলি জাতি সমস্যার ‘নিষ্পত্তি’ করলেন। তিনি তফসিলি জাতিসমূহকে হিন্দু ধর্মের আওতায় রাখতে এবং তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হন, এবং একই সাথে উচ্চবর্ণের স্বার্থে বর্ণ ব্যবস্থার কারাগার সংরক্ষণ করেন। দলিত নামে আখ্যায়িত তফসিলি জাতিসমূহ এখনো সেই একই কারাগারে বন্দী, যাকে গান্ধী ১৯৩০ এর দশকে সুরক্ষিত ও সংরক্ষণ করেছিলেন।
পরবর্তিতে যখন পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে আসে তখন আম্বেদকর লেখেন-

“There was nothing noble in the fast. It was a foul and filthy act. … It was a vile and wicked act. How can the untouchables regard such a man as honest and sincere?’’ (Quoted by Arundhati Roy, The Doctor and the Saint, from Babashaeb Ambedkar: Writings and Speeches, BAWS)

গান্ধীর কর্মকাণ্ডে আম্বেদকর এতোটাই মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে, ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Annihilation of Caste এর দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় তিনি লেখেন-

‘‘I shall be satisfied if I make the Hindus realize that they are the sick men of India, and their sickness is causing danger to the health and happiness of other Indians.’’

১০

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ছিল। তারা হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক শক্তির মধ্যে রাজনৈতিক শত্রুতা সৃষ্টি করতে তাদের নিজস্ব খেলা খেলছিল। জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের চটকদার কথাবার্তা সত্ত্বেও কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের নিজেদের উদ্যম খুব কমই ছিল। মওলানা মহম্মদ আলীর ভাষায় তারা ‘ভিক্ষা এবং প্রার্থনার’ রাজনীতি করছিল।

গান্ধী ভারতের সব থেকে মহান জাতীয় নেতা হিসেবে খ্যাত ছিলেন। কিন্তু তাঁর জাতীয়তাবাদ ছিল আপোষের রাজনীতি। তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করতে চাইতেন, কিন্তু একটি সীমার বাইরে তাদের বিরোধিতা কখনো করতেন না। যখনই এই সীমা লঙ্ঘিত হবার সম্ভাবনা দেখা দিত, গান্ধী তখনই তাতে হস্তক্ষেপ করতেন এবং সেই আন্দোলন থামিয়ে দিতেন। তিনি অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেছিলেন, কিন্তু আন্দোলন সরকারের সাথে সহিংস সংঘাতে রূপ নেয়ার প্রশ্নের তাঁর মধ্যে সব সময় এক অদ্ভুত অনিচ্ছা কাজ করত। এটাকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য তিনি তাঁর অহিংসা তত্ত্ব তুলে ধরতেন। কিন্তু তাঁর ঐ পদের অহিংসা ছিল অহিংসা নামের অযোগ্য। মজার ব্যাপার এই যে, তাঁর অহিংসা শুধুমাত্র ভারতীয়দের বেলায় প্রযোজ্য ছিল। তিনি সবসময় ভারতীয়দের যে কোন সহিংস কাজের বিরোধিতা করতেন। তাঁর চৌরী চৌরায় সহিংসতার বিরোধিতা খুবই বিখ্যাত ছিল। কিন্তু তাঁকে কখনোই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের হিংসাত্মক কাজের বিরোধিতা এবং নিন্দা করতে দেখা যায় নি। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক হাজার হাজার নিরপরাধ ভারতীয়র গণহত্যার নিন্দা জানাতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। ১৯৩১ সালে ভগৎ সিং এর ফাঁসির নিন্দা জানাতে তিনি অস্বীকার করেন। ১৯৩১ সালে গারওয়াল রেজিমেন্টের সৈনিকেরা পেশাওয়ারের কিসাখানি বাজারে নিরপরাধ মানুষের উপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি তাঁর “অহিংসার” আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রকাশ্যে এই বলে তার নিন্দা করেন যে, একজন সৈনিকের তার উর্ধ্বতনের নির্দেশ অবশ্যই মেনে চলা উচিৎ এবং সেটা না করলে সেনাবাহিনীতে কোন শৃঙ্খলা থাকবে না! যখন তাঁরা ক্ষমতায় থাকবেন তখন তাঁদেরও প্রয়োজন হবে একটি সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীর!! গারওয়াল রেজিমেন্টের সৈনিকদের সমর্থন জানিয়ে তিনি বিশৃঙ্খলাকে উৎসাহিত করতে চান নি!!!

গান্ধী যা প্রচার করতেন বাস্তবতঃ তা কখনও অনুশীলন করতেন না। এটি শুধু উপরে উল্লেখিত ঘটনাগুলির ক্ষেত্রেই সত্য ছিল এমন নয়, বরং মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সাথে যে আচরণ তিনি করেছিলেন সে ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। তাঁর ধর্মবিযুক্ততা এবং ‘হরিজন’দের প্রতি ভালোবাসা ভান ছাড়া আর কিছু ছিল না। তাঁর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরোধিতা ছিল একই চরিত্রের। তিনি স্বাধীনতাকে ভালবাসতেন কিন্তু বিশের দশকের শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার দাবী উত্থাপন করেন নি। বস্তুত গান্ধী, জিন্নাহ্, নেহরু, প্যাটেল প্রভৃতি ভারতীয় বুর্জোয়া নেতারা ছিলেন মেরুদণ্ডহীন। ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতা ছাড়া ভারতের স্বাধীনতার কথা তাঁরা চিন্তাও করতে পারতেন না! এবং আসলেই, শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের দ্ব্যর্থহীন ‘সহযোগিতা’র মাধ্যমেই তাঁরা তা পেয়েছিলেন।

১১

জি.ডি. বিড়লার সাথে কংগ্রেস নেতাদের সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের পুত্র সর্বপল্লী গোপাল জওহরলাল নেহরুর জীবনীতে বলেন যে, প্যাটেল, রাজেন্দ্র প্রসাদ এবং অন্যান্যরা বিড়লার কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ গ্রহণ করতেন। নেহরু সরাসরি বিড়লার কাছ থেকে সেটা নিতে অস্বীকার করেছিলেন। তাই বিড়লা তা গান্ধীকে দিতেন এবং নেহরু তাঁর কাছ থেকে নিয়ে নিতেন! যদিও বিড়লা গান্ধীর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তাঁর দেখাশোনা করতেন, তবুও গান্ধী সব সময়ে এমন একটা ভাব দেখাতে চেষ্টা করতেন যেন তিনি একজন দরিদ্র লোকের জীবন যাপন করছেন। তিনি তৃতীয় শ্রেণীতে ভ্রমণ করতেন, কিন্তু তাঁর তৃতীয় শ্রেণী সাধারণ যাত্রীদের তৃতীয় শ্রেণী ছিল না। সরোজিনী নায়ডু একবার পরিহাসছলে বলছিলেন, “বাপুকে দারিদ্র্যের মধ্যে রাখতে আমাদের প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়।”

গান্ধীর মৃত্যুর পর বিড়লা বাপু নামে দুই খণ্ডে কিছু নথি প্রকাশ করেছিলেন। গান্ধীর একটি অভ্যাস ছিল সব কিছুর অনুলিপি ̶ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধিদের কাছে লিখিত পত্র, রাজনৈতিক দলিল, এমনকি ব্যক্তিগত চিঠি ̶ বিড়লাকে পাঠানো। বিড়লার কাছে লিখিত চিঠিসহ এই চিঠিগুলি সবই এই দুটি খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত। এগুলোকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখলে বোঝা যায় আসলে কে কার বাপু ছিলেন।

১২

তিরিশের দশকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের চরিত্রে পরিবর্তন ঘটছিল। এটা ছিল বিভিন্ন স্বার্থের একটি বিস্তৃত প্ল্যাটফর্ম। কমিউনিস্ট পার্টির মতো প্রগতিশীল উপাদান, এম. এন. রায় এবং উদারনৈতিকরা এর সাথে যুক্ত ছিল। কংগ্রেসে হিন্দু জমিদার, উচ্চবর্ণের হিন্দু ব্যবসায়ী এবং জি.ডি. বিড়লা ও টাটার মতো মাড়োয়াড়ী শিল্পপতিদের প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রগতিশীল উপাদানগুলি তিরিশের দশকের শেষ দিকে তাকে ছেড়ে যেতে শুরু করে। জাতীয়তাবাদী মুসলিম হিসেবে পরিচিত বিপুল সংখ্যক মানুষ, যাঁরা ছিলেন কংগ্রেসের অনুগত সদস্য, তাঁরা কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং তাঁদের অধিকাংশই মুসলিম লীগে যোগদান করেন। এমনকি সুভাষ বসুর পক্ষেও কংগ্রেসে থাকা সম্ভব ছিল না। তাঁকে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল। কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের পাকিস্তান প্রস্তাব, যা লাহোর প্রস্তাব নামেও পরিচিত, দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে তৈরী হয়েছিল। কংগ্রেস এবং অন্যান্য সংগঠন একে সাম্প্রদায়িক বলে নিন্দা করেছিল। দ্বি-জাতি তত্ত্ব সাম্প্রদায়িক ছিল, তবে তা নতুন কিছু ছিল না।

১৩

১৮৬০ সালে নবগোপাল মিত্র ‘হিন্দু মেলা’ এবং জাতীয়তাবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে ‘জাতীয় সভা’ বা জাতীয় সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। জাতীয়তাবাদ বলতে তাঁরা হিন্দু জাতীয়তাবাদ বোঝাতেন। ১৮৬৭ সালের হিন্দু মেলায় তাঁরা ঘোষণা করেন যে, হিন্দুরা একটি স্বতন্ত্র জাতি। কিন্তু তাঁদের এমন কী প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল নিজেদেরকে পৃথক জাতি হিসেবে ঘোষণা করার? কাদের বিরুদ্ধে ছিল এই ঘোষণা? এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তাদের সামনে সুযোগ সুবিধার যে ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছিল তাতে মুসলমানদেরই প্রতিপক্ষ বিবেচনা করা হত।

হিন্দু মেলা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। ব্রাহ্ম সমাজের বিশিষ্ট নেতা রাজনারায়ণ বসু তাঁর আত্মজীবনীতে দাবী করেন যে, তিনি নবগোপাল মিত্রকে হিন্দু মেলা সংগঠিত করতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। একজন ব্রাহ্ম হওয়া সত্ত্বেও তিনি হিন্দুদেরকে একটি স্বতন্ত্র জাতি বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু তিনিই একমাত্র ব্রাহ্ম নন যিনি এই মত পোষণ করতেন। এমন লোক আরও ছিল। আপাতঃদৃষ্টিতে খুবই বিস্ময়কর বিষয় হলো ব্রাহ্মরা, যাঁরা হিন্দু ধর্ম পরিত্যাগ করেছিলেন এবং একটি ভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী গঠন করেছিলেন, তাঁরাও সময় সময় নিজেদেরকে হিন্দু হিসেবে পরিচয় দেওয়া থেকে বিরত থাকেন নি। ১৮৭১ সালে নবগোপাল মিত্রের জাতীয় সভা কর্তৃক আয়োজিত এবং ব্রাহ্ম সমাজের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা, রবীন্দ্রনাথের পিতা, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌরহিত্যে অনুষ্ঠিত এক সভায় রাজনারায়ণ বসু হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব বিষয়ক তাঁর বিখ্যাত ভাষণ প্রদান করেন। হিন্দু ধর্ম থেকে ব্রাহ্ম সমাজের নাড়ীর সংযোগ ছিন্ন হয়নি।

শঙ্করাচার্য অষ্টম শতাব্দীতে বৌদ্ধ ধর্মের জোয়ার মোকাবেলা ও বিরোধিতা করার জন্য তাঁর ধর্মীয় আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীতে ইসলাম ধর্মের অগ্রগতির প্রতিক্রিয়ায় শ্রীচৈতন্য হিন্দু ধর্মের স্বকৃত সংস্করণ প্রচার করেছিলেন। বাঙলায় ঊনবিংশ শতাব্দীতে এমন সময়ে ব্রাহ্ম ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছিল যখন মধ্যশ্রেণীর শিক্ষিত তরুণরা খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়ছিল। এই কারণে ব্রাহ্ম ধর্মেরও সুস্পষ্ট শ্রেণী চরিত্র ছিল। ব্রাহ্ম সমাজে কৃষক, শ্রমিক অথবা গরীব লোকের কোন স্থান ছিল না। এটা ছিল উচ্চ এবং মধ্য শ্রেণীর ধর্ম।

ব্রাহ্ম ধর্মের কোন সুনির্দিষ্ট আদর্শিক ভিত্তি ছিল না। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল খ্রিস্ট ধর্মের একটি দুর্বল ঝোঁকের বিরুদ্ধে একটি দুর্বল প্রতিক্রিয়া। এর নিজস্ব কোন ধর্মগ্রন্থ ছিল না। তাঁরা বেদান্ত এবং উপনিষদ মেনে চলতেন। তাঁরা হিন্দুত্ব থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই শব্দটির ব্যাপক অর্থে নিজেদেরকে হিন্দু বিবেচনা করতেন এবং ‘হিন্দু জাতির’ সাথে একাত্মতা বোধ করতেন। কারণ ব্রাহ্ম ধর্ম প্রকৃতপক্ষে হিন্দু ধর্মেরই একটি সম্প্রদায় ছিল। শিক্ষিত মধ্যশ্রেণীর হিন্দুদের ওপর তাদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল এবং সে কারণে, হিন্দুদের পাশাপাশি, তাদেরও স্বতন্ত্র হিন্দু জাতীয় পরিচয়ের প্রতি আনুগত্য ঊনিশ শতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক ভারতে হিন্দু রাজের ধারণার প্রচার সুবিদিত। তিনি ছিলেন ঊনিশ শতকে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার সব থেকে বড় প্রতিনিধি ও হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার প্রধান তাত্ত্বিক। তাঁর শিক্ষায় অন্তর্নিহিত ছিল দ্বি-জাতি তত্ত্ব। রবীন্দ্রনাথ বাঙালীকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিলেন এবং তার ভাষা এবং সংস্কৃতিকে রূপ দিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মীয় প্রভাব ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ও পরবর্তীকালে এক চালিকা শক্তি ছিল। সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো তাঁর লেখা থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজে পেত এবং তারা মুসলমানদেরকে দলভুক্ত করত না।

কংগ্রেস ও অন্যান্য দলের কেউই বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার সমালোচনা করেন নি। বিপরীতে, কংগ্রেস তাঁর পুনরুজ্জীবনবাদী ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটিকে ভারতের জাতীয় সংগীত (National Song) হিসেবে গ্রহণ করেছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত ‘বন্দে মাতরম’ দ্বারা অভিভূত ছিলেন। এটা খুবই বিস্ময়কর যে এমনকি নকশালপন্থীরাও বঙ্কিমচন্দ্রের কোন সমালোচনা করেন নি। তাঁরা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং রবীন্দ্রনাথের মূর্তি ভেঙেছেন, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের মূর্তিকে তাঁরা স্পর্শ করেন নি। রাজনৈতিক পরিস্থিতির এটি এমন একটি দিক যাকে ছোট করে দেখা কিংবা উপেক্ষা করা চলে না।

হিন্দু জাতীয়তাবাদের জাগরণের সময় হিন্দু মেলা ছিল হিন্দুদের একটি আক্রমণাত্মক অবস্থান। রাজনৈতিক লাইন হিসেবে সাম্প্রদায়িকতার বীজ হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানকালেই বপিত হয়েছিল। নবগোপাল মিত্র ও ব্রাহ্ম সমাজের রাজনারায়ণ বসুর দ্বি-জাতি তত্ত্ব ছিল চরিত্রগতভাবে আক্রমণাত্মক। জিন্নাহ্ দ্বি-জাতি তত্ত্ব যেভাবে পাকিস্তান প্রস্তাবে অন্তর্নিহিত ছিল তা প্রণীত হয়েছিল হিন্দু বুর্জোয়া শ্রেণীর অগ্রগতির মোকাবেলা করা এবং পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা ও উত্তরণের জন্য। চরিত্রগতভাবে এটি ছিল আত্মরক্ষামূলক।

১৯৪০ পরবর্তীকালে ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার আধিপত্য দেখা দেয়। সেই সময়ে ভারতীয় পরিস্থিতিতে চারটি মূল দ্বন্দ্ব বিরাজ করছিল – ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের সাথে ভারতের জনগণের দ্বন্দ্ব, বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব এবং শ্রেণী দ্বন্দ্ব। চল্লিশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব আর সরকারের সাথে জনগণের দ্বন্দ্ব অন্য দুটি দ্বন্দ্বকে অধীনস্ত করে ফেলে এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী নির্ধারকে পরিণত হয়। স্বাধীনতা এবং দেশ ভাগের মধ্য দিয়ে এই দ্বন্দ্বগুলোর মীমাংসা হয়।

১৪

১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ সরকার ভারতকে স্বাধীনতা প্রদানের আপাতঃ উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতীয় নেতাদের সাথে আলাপ আলোচনার জন্য দিল্লীতে একটি কেবিনেট মিশন প্রেরণ করে। কেবিনেট মিশন এবং কংগ্রেস ও লীগ প্রায় তিন মাসব্যাপী প্রলম্বিত সংলাপের পর একটি চুক্তিতে উপনীত হয়। স্বাধীন ভারতে একটি ফেডারেল সরকারের অধীনে থাকবে তিনটি ইউনিট এর একটি থাকবে পশ্চিমে, দ্বিতীয়টি পূর্বে আর তৃতীয়টি থাকবে মধ্য এবং দক্ষিণাঞ্চলে। জিন্নাহ্ এতে সম্মত হন এবং পাকিস্তানের জন্য তাঁর দাবী ত্যাগ করেন। সব কিছুই ভালোভাবে চলছিল। কিন্তু কংগ্রেসের নবনির্বাচিত সভাপতি জওহরলাল নেহরু হঠাৎ করে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে, তারা চুক্তি মানতে বাধ্য নন এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার রাখেন। প্রস্তাবিত সংবিধান সভা-ই নির্ধারণ করবে স্বাধীন ভারতে কোন ধরনের সরকার থাকবে।

এই ঘোষণার মাধ্যমে নেহরু প্রকৃতপক্ষে সমঝোতা চুক্তিকে উড়িয়ে দিলেন। যদিও দৃশ্যতঃ এই কাজ করা হয়েছিল আকস্মিকভাবে, তবুও এটা ভাবা ভুল হবে যে, প্যাটেল ও গান্ধীর সমর্থন এবং অনুমোদন ছাড়াই নেহরু একতরফাভাবে এ কাজ করেছিলেন। প্যাটেল প্রকৃতপক্ষে ছিলেন আরএসএস ঘরানার হিন্দু (নরেন্দ্র মোদীর সরকার আহমেদাবাদে প্যাটেলের একটি সুউচ্চ মূর্তি নিমার্ণ করেছে) এবং কংগ্রেসের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা। তিনি মুসলমানদের ঘৃণা করতেন এবং তাঁদের সাথে কোন সম্পর্কই চাননি। একটি ফেডারেল সরকারে মুসলমানদের সাথে কাজ করার কথা তিনি ভাবতেও পারতেন না। তিনি এবং গান্ধী কেউই নেহরুর ঘোষণার বিরোধিতা করেন নি। কংগ্রেসের কোনও কমিটি তাঁর কাছ থেকে কোন ব্যাখ্যাও চায়নি। আবুল কালাম আজাদ বিরক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি কোন প্রকাশ্য বিবৃতি দেন নি। তিনি ছিলেন কংগ্রেসের একজন গুরুত্ববিহীন নেতা। পরবর্তীকালে তিনি India Wins Freedom গ্রন্থে এই বিষয়ে লিখেছেন। কংগ্রেসের ছোট কিছু গ্রুপ ও চক্রে এ বিষয়ে মৃদু সমালোচনা ছিল।

এরপর যা অবধারিত তা-ই ঘটেছিল। জিন্নাহ্ নেহরুর এই ঘোষণাকে একটি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচনা করেন, কেবিনেট মিশন, ভাইসরয় ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ আনেন, এবং পাকিস্তানের দাবীতে ফিরে যান। এর জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুতই ছিল। জওহরলাল নেহরু এবং কংগ্রেস এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল যেখানে পাকিস্তান অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

নেহরুর সংবাদ সম্মেলনের পর জিন্নাহ্ ৩০শে জুলাই বোম্বাইতে মুসলিম লীগের কাউন্সিল আহ্বান করেন। সেই কাউন্সিলে ১৬ই অগাস্টকে Direct Action Day হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৪ই অগাস্ট একটি সংবাদ সম্মেলনে জিন্নাহ্ ঘোষণা করেন যে, ১৬ই অগাস্ট তারিখে অনুষ্ঠিতব্য Direct Action Day পালনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো ভারতীয় মুসলমানরা যে পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হতে যাচ্ছেন তা মোকাবেলার জন্য তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

১৬ই অগাস্ট বঙ্গীয় মুসলিম লীগ কলকাতা ময়দানে একটি জনসভা আহ্বান করে। একটি বিশাল সংক্ষিপ্ত সভা অনুষ্টিত হয়, কিন্তু শহরে দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। এই দাঙ্গা ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে কয়েক দিন অব্যাহত থাকে যার ফলে হাজার হাজার নিরপরাধ হিন্দু এবং মুসলমান নিহত হন। এই দাঙ্গা হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার শত্রুতা এবং ঘৃণাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল যা ছিল অভূতপূর্ব।

সংগঠন হিসেবে এই দাঙ্গার সাথে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের সরাসরি কোন সম্পৃক্ততা ছিল না। কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হবার পর যে পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল সেই পরিস্থিতিই এই ধরনের বৈরীতা সৃষ্টির শর্ত তৈরী করেছিল এবং ব্রিটিশ সরকার এর পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেছিল। তারা হিন্দু মহাসভা, কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগে অবস্থানকারী তাদের চরদের সংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই দাঙ্গা সংঘটিত করেছিল। হিন্দু এবং মুসলমানরা দাঙ্গার জন্য পরস্পরকে দায়ী করেছিল, কিন্তু সকলে ব্রিটিশদের ভুলে গিয়েছিল, যাদেরকে ভাগ কর ও শাসন কর নীতির জন্য সবসময় সমালোচনা করা হয়। দাঙ্গা চলতে থাকে এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, এবং পরবর্তী রাজনৈতিক স্রোতধারার একটি নির্ধারকে পরিণত হয়। এটি ব্রিটিশ সরকারকে তাদের শর্তে ভারতের স্বাধীনতা প্রদান এবং তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশ ভাগ করতে সহায়তা করে।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই)-র সম্পাদক, পি.সি. যোশী পাঞ্জাব দাঙ্গার উপর একটি পুস্তিকা লিখেছিলেন। তাতে তিনি বাস্তব প্রমাণের ভিত্তিতে বর্ণনা করেন কিভাবে ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার দাঙ্গা সংঘটিত করেছিল।

১৫

প্রখ্যাত মার্কসবাদী চিন্তক এবং ইতিহাসবিদ সুনীতি কুমার ঘোষ তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ India and the Raj গ্রন্থে লিখেছেন-

“Viceroy Wavell noted, perhaps not unjustly, that Patel was strongly influenced by the capitalists and lives in the pocket of one of them, G. D. Birla. Not only Gandhi and Patel but other close associates of theirs had also pleasant relationship with the big bourgeois, though the bounties they enjoyed were certainly not equally generous. Rajendra Prasad acknowledged how he was benefitted by such relationship. S. Gopal writes that the Birla family provided fairly substantive monthly allowances to many leading Congressmen. It would be no

wonder if those who paid the piper called the tune. “By his close association with many millionaires and shets such as Jamnalal Bajaj, Ambala Sarabhai, Ghanashamdas Birla and others’, writes Rani Dhavan Shankardas, ‘the Mahatma gained a financial strength without which Congress politics could scarcely be carried out and which was no less vital than the strength which shets gained from him.”

কংগ্রেস এবং কংগ্রেসের নেতা গান্ধী, প্যাটেল, নেহরু, রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রভৃতির সাথে ভারতীয় বড় বুর্জোয়াদের সম্পর্কের একটি বিস্তারিত পর্যালোচনা ও তদন্ত চোখ খুলে দেয়ার মত হবে। এই কাজ বৃহৎ বুর্জোয়াদের পরিচারক হিসেবে কংগ্রেসের ভূমিকা স্পষ্ট করবে। দেখাবে যে, কংগ্রেসের উত্তরসূরী হিসেবে বিজেপি এখন একই নৌকায় চড়েছে। কংগ্রেসের ছিল বিড়লা, টাটা, জামনালাল বাজাজ, আম্বালা সারাভাই ইত্যাদি। বিজেপির আছে আম্বানি ব্রাদার্স, আদানি, টাটা ইত্যাদি। একই ঐতিহ্য কোন দৃশ্যমান পার্থক্য ছাড়াই কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে প্রবাহিত হচ্ছে।

১৬

কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হবার পর ব্রিটিশ সরকার ভারত বিভক্তির একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরী করে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য ১৯৪৭ সালের মার্চ মাসে লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে ভারতে প্রেরণ করে। দূর্দান্ত দক্ষতা ও বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে মাউন্টব্যাটেন তাঁর কার্য সম্পাদন করেন। তিনি যেভাবে অগ্রসর হন তা এটাই নির্দেশ করে যে, ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্র এবং অভ্যেস সম্পর্কে তাঁকে পুরোপুরি অবহিত করা হয়েছিল। তিনি নিপুন দক্ষতার সাথে তাঁর চাল চেলেছিলেন।

মাউন্টব্যাটেন যখন ভারতে এসে পৌঁছান তখন ভারত-বিভক্তি আর কোন বিতর্কিত বিষয় ছিল না। সকল পক্ষই এটাকে একটা মীমাংসিত বিষয় হিসেবে ধরে নিয়েছিল। কিন্তু একটি নতুন রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দেয়। কংগ্রেস দাবী করে যে, ভারত বিভক্তির প্রেক্ষাপটে বাঙলা ও পাঞ্জাবকেও হিন্দু ও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা অনুযায়ী ভাগ করতে হবে। হিন্দুদের একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে কংগ্রেসের পরিচয় ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মুখোশের আড়ালে রাখা আর সম্ভব ছিল না। পশ্চিমবঙ্গ ছিল মাড়োয়াড়ী মুৎসুদ্দী পুঁজির প্রধান ঘাঁটি। বিড়লা এবং অন্যান্য মাড়োয়াড়ী পুঁজিপতিরা পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতে দিতে পারে না। এ জন্য নেহরু ও প্যাটেল বঙ্গভঙ্গের দাবী করেছিলেন। এমনকি মাউন্টব্যাটেনের আগমনের পূর্বেই ১৯৪৭ সালের ৯ই মার্চ নেহরু লর্ড ওয়েভেলের কাছে একটি পত্র লেখেন যাতে তিনি প্রস্তাব করেন “the partition of Bengal and Punjab even if India was not partitioned. Birla’s Hindustan Times had raised the same demand which was echoed by Shyamaprasad Mukherjee of the Hindu Mahashava”. (Suniti Kumar Ghosh, India and the Raj, Shahtya Samsad, 2007, p. 596)

বাঙলা ভাগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। শরৎচন্দ্র বসু ও কিরণ শঙ্কর রায়ের মতো কংগ্রেস নেতা এবং মুসলিম লীগের নেতারা এক সাথে বসে এর বিরোধিতার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাঁরা অখণ্ড সার্বভৌম বাঙলার জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরী করেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব এতে হস্তক্ষেপ করে। প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি তাদের সভায় হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে আমন্ত্রণ জানায়, কিন্তু শরৎ বসু এবং কিরণ শঙ্কর রায়কে বাইরে রাখে, যদিও তাঁরা ছিলেন বাঙলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই কংগ্রেস নেতা। কেন্দ্রের নির্দেশে প্রাদেশিক কমিটি অখণ্ড বাঙলার বিরোধিতা করে এবং দেশভাগের দাবী জানায়। তাহলেও, কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে সার্বভৌম ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন বাঙলার একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরী করা হয় এবং তাতে শরৎ বসু এবং আবুল হাশিম স্বাক্ষর করেন। জিন্নাহ্ এই প্রস্তাবের প্রতি ঈষদুষ্ণ সমর্থন প্রদান করেন, কিন্তু কংগ্রেস তা প্রত্যাখ্যান করে।

গান্ধী শরৎ বসুকে লিখেছিলেন: “আমি আপনার খসড়াটি পড়েছি। আমি এখন পণ্ডিত নেহরু এবং সরদারের সাথে এই স্কিমটি নিয়ে মোটামুটি আলোচনা করেছি। তাঁরা দুজনই প্রস্তাবটির ঘোর বিরোধী এবং তাঁদের ধারণা এটা হচ্ছে হিন্দু এবং তফসিলি জাতিভুক্ত নেতাদের বিভক্ত করার একটি কৌশল মাত্র। তাঁদের কাছে এটা কোন সন্দেহ নয় বরং দৃঢ় বিশ্বাস।” (Sarat Chandra Bose Papers) শরৎ বসুর অন্য একটি পত্রের জবাবে গান্ধী তাঁকে লেখেন, “আপনার নোটটি আমার কাছে আছে। খসড়াটির মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে এমন কিছুই বলা নেই যে, শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী কিছু করা হবে না। সরকারের প্রতিটি কাজকে অবশ্যই নির্বাহী ও আইন পরিষদের কমপক্ষে দুই তৃতীয়াংশ হিন্দু সদস্যের সহযোগিতা বহন করতে হবে।” (Sarat Chandra Bose Papers)

এখানে, খুব স্পষ্টভাবে, গান্ধী সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের থেকে হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষার জন্য হিন্দু হিসেবে তাঁর মতামত ব্যক্ত করছিলেন। নিঃসন্দেহে কংগ্রেস বাঙলায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবী করেছিল সাম্প্রদায়িক ভাষায়। সেই পরিস্থিতিতে শরৎ বসু এক পত্রে গান্ধীকে বলেছিলেন, “এটা আমার জন্য শোকের যখন দেখি যে, যে কংগ্রেস এক সময় একটি বৃহৎ জাতীয় সংগঠন ছিল তা দ্রুত শুধুমাত্র হিন্দুদের সংগঠনে পরিণত হচ্ছে।” (Sarat Chandra Bose Papers) মার্চ এবং এপ্রিলে মাউন্টব্যাটেন ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর নিজের উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ চালিয়ে যান। তিনি কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে গান্ধী, নেহরু ও প্যাটেল এবং মুসলিম লীগের সভাপতি জিন্নাহর সাথে বহুবার দীর্ঘ আলোচনা করেন। তিনি মওলানা আজাদ, লিয়াকত আলী, বলদেব সিংহ প্রমুখ নেতাদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।

শুরু থেকেই মাউন্টব্যাটেন নেহরুর সাথে এক ধরনের মধুর সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যিনি মাউন্টব্যাটেন পরিবারের সদস্য প্রায় হয়ে উঠেছিলেন। মাউন্টব্যাটেন কূটনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে এই সম্পর্ককে কাজে লাগান। নেহরু কার্যতঃ মাউন্টব্যাটেনের সহযোগীতে পরিণত হন। এটি হঠাৎ করে ঘটেনি। দুই নেহরু, পিতা ও পুত্র; গান্ধী, প্যাটেল, রাজেন্দ্র প্রসাদ, রাজাগোপাল আচারিয়া প্রমুখ সকলেই ব্রিটিশ ভারতীয় প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিলেন। তাঁদের গোপন এবং দালালসুলভ কর্মকাণ্ড ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক বিকাশ ধারাকে বহুলাংশে পরিচালনা করে। ব্রিটিশ সরকারের প্রতি তাঁদের আনুগত্য এবং সহযোগিতার অসংখ্য উদাহরণ আছে। কিন্তু ইতিহাসবিদ এবং মধ্যশ্রেণীভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে খুব কম লোকই আছেন যাঁরা এই সত্যকে গ্রহণ করেন। ফলে গান্ধী, নেহরু, প্যাটেল প্রমুখ নেতারা ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের দেবমূর্তি হিসেবে টিকে আছেন।

জুন মাসে মাউন্টব্যাটেন তাঁর রোয়েদাদ উপস্থাপন করেন। তাঁর রোয়েদাদ অনুযায়ী ভারতকে ভারত এবং পাকিস্তান এই দুইভাগে বিভক্ত করার প্রস্তাব করা হয়; বাঙলা এবং পাঞ্জাবকে বিভক্ত, সিলেট এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মতামত গ্রহণের জন্য গণভোটের আয়োজন, এবং ভারত ও পাকিস্তানের জন্য দুটি ভিন্ন সংবিধান সভা গঠন করার প্রস্তাব করা হয়। ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন সন্ধ্যায় মাউন্টব্যাটেন, নেহরু, জিন্নাহ্ ও বলদেব সিংহ প্রস্তাবটি অনুমোদন করে রেডিও সম্প্রচার করেন।

যেভাবে ভারতকে ভাগ করা হয়েছিল তাতে কংগ্রেসেরই লাভ হয়েছিল। জিন্নাহর ভাষায় মুসলিম লীগ একটি ছেঁড়াখোড়া ও পোকায়-খাওয়া পাকিস্তান পেয়েছে। সাম্রাজিক ব্রিটেনের সর্বশেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন কংগ্রেসের প্রিয়পাত্রে পরিণত হন। তারা তাঁকে স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান নিযুক্ত করে। এটি ছিল একটি বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেহরু তাঁর মন্ত্রীসভা গঠন করেন। এটা কোন জোটগত মন্ত্রীসভা ছিল না। কিন্তু তিনি হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে তাঁর মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করেন।

১৭

১৯৪৭ সালে ভারতের এবং ফলস্বরূপ বাঙলা ও পাঞ্জাবের বিভক্তি, দৃশ্যত যা ছিল এর লক্ষ্য, সেই ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমস্যার সমাধান করার পরিবর্তে, সাবেক ব্রিটিশ-ভারতের ধর্মীয় সংখ্যাগুরুর শাসন কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু ছিল না, কারণ মুসলিম লীগের ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে ভারতের পূর্ব এবং পশ্চিমে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। সুতরাং, প্রকৃত অর্থে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অথবা মুসলিম লীগের ঘোষিত লক্ষ্যে ভারতে মুসলমান কিংবা হিন্দু কিংবা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর জন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমস্যা সমাধানের কোন প্রশ্নই ছিল না। ১৯৪০ এর দশকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকালে যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল তা হল, কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ উভয় দলই যথাক্রমে হিন্দু এবং মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে ভারতীয় সামন্ত-বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থ জোরদারের চেষ্টায় নিয়োজিত ছিল। এই কাজে প্রথমোক্তরা নিয়োজিত ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নামে অখণ্ড ভারতের পোষাক পরে, এবং দ্বিতীয়োক্তরা ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের নামে, যারা বাস্তবে পূর্ব এবং উত্তর ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ।

১৯৪০ এর দশকে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে যা খুবই বিস্ময়কর ছিল তা হলো, যুক্তপ্রদেশ, বিহার, আসাম এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশসমূহের মুসলমানরা পাকিস্তানের দাবীতে বিপুল সংখ্যায় মুসলিম লীগে যোগদান করে, অথচ লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী তাদের অঞ্চলকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এটা ছিল একটি দুঃখজনক ঐতিহাসিক উদাহরণ যে, কিভাবে আবেগ-তাড়িত শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রচারণা ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান, বিচারবুদ্ধি এবং আত্মস্বার্থ বিবেচনাবোধকেও ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে, এবং জনসাধারণের মধ্যে ও লেখাপড়া জানা ও উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যেও রাজনৈতিক অন্ধত্ব সৃষ্টি করতে পারে।

ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নামে ধর্ম বর্ণ ভাষা নির্বিশেষে জনগণের সকল অংশের স্বার্থ রক্ষার যে ভান কংগ্রেস এতোকাল ধারণ করেছিল, স্বাধীনতার সময়ে যখন বাঙলা আর পাঞ্জাবের অখণ্ডতা রক্ষার গুরুতর প্রশ্নটি উত্থাপিত হল তখন সেটা ভেঙে পড়লো। কংগ্রেস ধর্মবিযুক্ত জাতীয়তাবাদের দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে মূলগতভাবে ও আনুষ্ঠানিকভাবে সরে এলো যখন তারা একই ভাষায় এবং একই বিবেচনা থেকে বঙ্গভঙ্গের দাবী উত্থাপন করলো যেভাবে ও যে উদ্দেশ্যে মুসলিম লীগ পাকিস্তানের দাবী করেছিল।

স্বাধীন ভারতে বৃহৎ হিন্দু এবং মাড়োয়াড়ী পুঁজির শাসনের উদ্বোধন হয়। গান্ধী, নেহরু ও প্যাটেলের মতো কংগ্রেস নেতারা এ জন্য কাজ করেছিলেন। তাঁরা অবিভক্ত ভারতের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন কারণ অবিভক্ত ভারতে হিন্দুরা হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন অন্যান্য সংখ্যালঘু এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের স্বার্থের বিনিময়ে উচ্চ বর্ণের হিন্দু ভূমি মালিক, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করবে ও এগিয়ে নেবে। স্বাধীন ভারত অখণ্ড ভারতের থেকে আকারে ছোট ছিল, কিন্তু স্বাধীন ভারত উপরোল্লিখিত স্বার্থ সকল সুযোগ সুবিধাসমেত তাঁদেরকে প্রদান করে যা তাঁরা অখণ্ড ভারতে চেয়েছিলেন।

১৮

ভারতের রাজনীতিতে গরু একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ছিল এবং এখনো আছে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে, ১৯৪৭ সালের জুলাই এবং অগাস্টে, রাজেন্দ্র প্রসাদ গরু জবাই নিষিদ্ধকরণে খুবই সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি গরু জবাই নিষিদ্ধ ঘোষণার জন্য নেহরুর ওপর চাপ সৃষ্টি করেন এবং এই মর্মে তাঁর কাছে পত্র লেখেন। নেহরু সাম্প্রদায়িক ছিলেন কিন্তু রাজেন্দ্র প্রসাদের মত নন। তদুপরি, সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর পক্ষে গরু খাওয়া ও গরু জবাই নিষিদ্ধ করা সম্ভব ছিল না। সে কারণে তিনি রাজেন্দ্র প্রসাদের পত্র উপেক্ষা করেছিলেন, কিন্তু ১৯৪৭ সাল থেকে অধিকাংশ ভারতীয় রাজ্যে গরু জবাই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পেয়েছিল। এটা নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে তাঁর পুত্র সঞ্জয় গান্ধী দিল্লি জামে মসজিদের আশেপাশে অবস্থিত সব কাবাবের দোকান ভেঙে দেন এবং শহরে গরু জবাই নিষিদ্ধ করেন।

বিজেপির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদী পশ্চিমবঙ্গ এবং কেরালা ছাড়া গোটা ভারতে গরু জবাইয়ের ওপর কার্যতঃ নিষেধাজ্ঞা জারী করেছেন এবং বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারে তাঁর সহযোগীরা প্রায়ই মুসলমান, খ্রিস্টান এবং দলিতদের উপর গরু জবাই ও গরুর গোশ্ খাওয়ার মিথ্যা অভিযোগে নির্যাতন জারী রেখেছে। তাদের অনেককে হত্যা করা হয়েছে।

১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারী এক আরএসএস কর্মীর হাতে গান্ধী নিহত হন। সরকার আরএসএস’কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু এর অল্পকাল পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার প্যাটেল আরএসএস-এর ওপর থেকে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।

১৯

স্বাধীনতার পূর্বে মুসলমানদের জন্য যে সীমিত সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান ছিল তা স্বাধীন ভারতে কমতে শুরু করে। শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনার সম্ভাবনা উধাও হয়ে যায়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে উত্তর ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা অব্যাহত থাকে। কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারগুলো দাঙ্গা বন্ধ করতে ব্যর্থ হয় এবং এই পরিস্থিতি মুসলমানদের মনে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে। তাহলেও মুসলমানরা সাধারণভাবে কংগ্রেসকেই ভোট দিয়ে আসছিল যারা ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত একটানা তিরিশ বছর ক্ষমতায় ছিল। ১৯৭৭ সালে একটি অ-কংগ্রেসী সরকার ক্ষমতায় আসে। ১৯৮২ সালে কংগ্রেস নির্বাচনে বিজয় লাভ করে এবং ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরে আসেন। ১৯৮৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। রাজীব গান্ধীর পর নরসীমা রাও এর নেতৃত্বে একটি কংগ্রেস সরকার গঠিত হয়।

২০

১৯৮০ এর দশক থেকে সাম্প্রদায়িক শক্তি তাদের শক্তি অর্জন ও সংগঠিত হতে শুরু করে। বিজেপি সব থেকে শক্তিশালী সাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, শিব সেনা ইত্যাদির মতো আরএসএস ঘরানার দলগুলোও সংগঠিত হতে শুরু করে। সাম্প্রদায়িকতা দুর্বল হওয়ার পরিবর্তে অভূতপূর্ব শক্তি অর্জন করতে থাকে।

অযোধ্যায় ষোড়শ শতকের বাবরী মসজিদ এর মত ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসা হয়। আরএসএস বিজেপিসহ সঙ্ঘ পরিবারভুক্ত দলগুলি মসজিদটি গুঁড়িয়ে দিয়ে একই জায়গায় একটি হিন্দু মন্দির স্থাপনের দাবী তোলে। কোন ধরনের ঐতিহাসিক প্রমাণ ছাড়াই তারা দাবী করে যে, বাবরী মসজিদ মোগল সম্রাট বাবর নির্মাণ করেছিলেন রামচন্দ্রের জন্মস্থানে অবস্থিত একটি মন্দির ধ্বংস করে।

বিজেপির নেতৃত্বে সঙ্ঘ পরিবারভুক্ত দলগুলি মসজিদটি ধ্বংস করার আন্দোলনকে তীব্র করে তোলে, কিন্তু নরসীমা রাও এর কংগ্রেস সরকার এ ব্যাপারে উদাসীন থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর হাজার হাজার আরএসএস করসেবক বাবরী মসজিদ আক্রমণ করে ও তা ধ্বংস করে।

নরসীমা রাও এর সরকার করসেবকদেরকে থামাতে কোন রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করে নি। সেনাবাহিনী দিয়ে মসজিদটি ঘিরে রেখে তারা সহজেই তাদেরকে থামাতে পারত। কিন্তু আদৌ কিছুই করা হয়নি। যা ছিল চরম বিস্ময়কর তা হলো, সেই সংকটময় পরিস্থিতিতে নিজ কার্যালয়ে বসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও তাঁর বাড়ীতে পূজাঘরে দিন কাটিয়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের ক্ষেত্রে আরএসএস এর সাথে নরসীমা রাও এর কংগ্রেস সরকারের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে কার সন্দেহ থাকতে পারে?

জওহরলাল নেহরুর প্রথম মন্ত্রীসভায় হিন্দু মহাসভার সভাপতি ও উগ্র সাম্প্রদায়িক শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির অন্তর্ভুক্তি, সরদার প্যাটেল কর্তৃক আরএসএস এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বাবরী মসজিদ ধ্বংসের সময়ে নরসীমা রাও এর ভূমিকা এবং করসেবকদের দ্বারা মসজিদটির বাস্তবতঃ ধ্বংস নিঃসন্দেহে একই সূত্রে গাঁথা, এই সূত্র হল সাম্প্রদায়িকতার সূত্র।

২১

বাবরী মসজিদ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা দুর্বল হবার পরিবর্তে শক্তি অর্জন করতে শুরু করে। কংগ্রেসের পর দ্বিতীয় জাতীয় দল হিসেবে বিজেপির আবির্ভাব ঘটে এবং তারা ক্ষমতার কাছাকাছি চলে আসে। ১৯৯৬ সালে বিজেপি নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী তেরো দিনের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর তিনি ১৯৯৮-৯৯-তে আবার একটি কোয়ালিশন মন্ত্রীসভায় তেরো মাসের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন, তারপর ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন।

২০০১ সালে বিজেপি গুজরাটে ক্ষমতায় আসে এবং প্রাক্তন আরএসএস প্রচারক ও বিজেপি সদস্য নরেন্দ্র মোদী মুখ্যমন্ত্রী হন। ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর ২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদী গুজরাটে সাম্প্রদায়িকতার এক অগ্নিকুণ্ড প্রজ্বলিত করেন যাতে হাজার হাজার নিরীহ মুসলমান নিহত হন এবং ঘরবাড়ী থেকে উচ্ছেদ হন। ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। বিজেপি আরও কয়েকটি রাজ্যে সরকার গঠন করে এবং ভারতের সর্ব বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে ক্ষমতা সুসংহত করে।

২২

২০০৪ সালে কংগ্রেস কেন্দ্রে ক্ষমতায় ফিরে আসে। ২০০৫ সালের মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ভারতে মুসলমানদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাগত পরিস্থিতি পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে বিচারপতি রাজেন্দ্র সাচারকে প্রধান করে সাচার কমিটি নামে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেন। কমিটি তার প্রতিবেদনে মুসলমানদের শোচনীয় অবস্থার বর্ণনা দেয় এবং বলে যে মুসলমানদের অবস্থা দলিতদের থেকেও খারাপ। কমিটি কতিপয় সুপারিশ করেছিল, কিন্তু সরকার মুসলমানদের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য কোন পদক্ষেপ নেয়নি।

এর আগে ১৯৭৯ সালে, মোরারজী দেশাই এর জনতা পার্টি সরকার নিম্নবর্ণের হিন্দু বা দলিতদের অবস্থা অনুসন্ধানের জন্য বি.পি. মণ্ডলকে প্রধান করে মণ্ডল কমিশন নামে একটি কমিশন গঠন করে। কমিশন তার প্রতিবেদন পেশ করে, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর পরবর্তী দুটি কংগ্রেস সরকার তা চাপা দিয়ে রাখে। তার পর ১৯৯০ সালের অগাস্টে প্রধানমন্ত্রী ভি.পি. সিং এটি প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনে দলিতদের দূরবস্থার কথা বর্ণনা করা এবং কিছু সুপারিশ পেশ করা হয়েছিল। ভি.পি. সিং ঘোষণা করেন যে, তাঁরা এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করবেন এবং এ ব্যাপারে কার্যতঃ পদক্ষেপও গ্রহণ করতে শুরু করেন। কমিশন দলিতদের জন্য চাকরি সংরক্ষণ, শিক্ষা ক্ষেত্রে উৎসাহদান ইত্যাদির জন্য সুপারিশ করেছিল।

এর ফলে সরকারের মধ্যে সংকট সৃষ্টি হয়। এটা ছিল একটি কোয়ালিশন সরকার এবং বিজেপি ছিল তার শরীক। তারা শক্তভাবে এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে। এর বিরুদ্ধে উচ্চ বর্ণের হিন্দু ছাত্র ও অন্যান্যদের ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়, কারণ তারা মনে করছিল যে তাদের সুযোগ সুবিধা হ্রাস পাবে। বিজেপি ও সহযোগী দলগুলি এতে ইন্ধন যোগায় এবং আন্দোলন এক উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। বিজেপি কোয়ালিশন সরকার থেকে বেরিয়ে আসে এবং ভি.পি. সিং সরকারের পতন ঘটে।

মণ্ডল কমিশন রিপোর্ট উন্মোচন করে একের পর এক কংগ্রেস সরকার দলিত বা তফসিলি সম্প্রদায়ের জন্য কি করেছে আর কি করে নি। সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করে একের পর এক কংগ্রেস সরকার মুসলমানদের জন্য কি করেছে আর কি করে নি। দলিত এবং মুসলমানদের অবস্থা ক্রমাগত শোচনীয় হয়েছে।

ভারতের জনসংখ্যার পনেরো শতাংশ মুসলমান, কিন্তু তাদের কর্মসংস্থান দুই শতাংশের বেশী নয়। পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা তিরিশ শতাংশের বেশী, কিন্তু তাদের কর্মসংস্থান দুই শতাংশেরও কম। শিক্ষার দিক থেকে তারা হিন্দুদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। সিপিএম নেতৃত্বাধীন একটি বামপন্থী সরকার পশ্চিমবঙ্গে চৌত্রিশ বছর ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু মুসলমানদের অবস্থা অপরিবর্তিতই রয়ে যায়!

২৩

২০১৪ সালে বিজেপি নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হন। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রের সকল ভান ঝেড়ে ফেলে ভারত ফ্যাসিস্টদের শাসনের অধীনে চলে আসে। তারা খোলাখুলিভাবে ঘোষণা করে যে, মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী ও বহিরাগত এবং তাদেরকে ভারতীয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। তারা ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে, রাম রাজ্যে পরিণত করবে, এবং হিন্দুত্বের বিধিবিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করবে।

বিজেপি হিন্দু ধর্মের এক নতুন সংস্করণ উপস্থাপন করেছে, যার নাম হিন্দুত্ব, যা এক ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদ। কিন্তু বাস্তবে হিন্দু ধর্মে কোন মৌলবাদ থাকতে পারে না। মৌলবাদের জন্য প্রয়োজন একটি ধর্মীয় বই, একটি ধর্মগ্রন্থ, যার প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য বাধ্যতামূলক। অন্য কথায়, লিখিত বরাত বা রেফারেন্স ছাড়া কোন ধর্মীয় মৌলবাদ হতে পারে না। ত্রিপিটক, তালমুদ, বাইবেল, কোরআন, গ্রন্থ সাহেব হলো যথাক্রমে বৌদ্ধ, ইহুদী, খ্রিস্টান, মুসলমান এবং শিখদের ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু হিন্দু ধর্মে এমন কোন ধর্মগ্রন্থ নেই। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত এবং গীতায় কোন আস্থা না থাকা সত্ত্বেও একজন ব্যক্তি হিন্দু হতে পারেন। এমনকি চার্বাকের মতো একজন নাস্তিকও হিন্দু হিসেবে বিবেচিত।

হিন্দু ধর্মে মূল হল বর্ণ ব্যবস্থা। ধর্মের সাথে সাম্প্রদায়িকতার সম্পর্ক অবিচ্ছিন্ন নয়, কিন্তু বর্ণ ব্যবস্থার সাথে সাম্প্রদায়িকতার সম্পর্ক অবিচ্ছিন্ন। এ কারণে, বহু বছর পরে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অগ্রগতির সাথে সাথে সাম্প্রদায়িকতা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। বর্ণ ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে দুর্বল হবে, কিন্তু আরও কত দিন তা টিকে থাকবে বলা মুশকিল।

হিন্দু ধর্মকে এক ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদ হিসেবে উপস্থাপন করে, আরএসএস ও বিজেপিসহ তাদের ঘরাণার দলগুলি কার্যতঃ একটি মিথ্যা হিন্দুত্বকে উপস্থিত করেছে। হিন্দুত্বকে গৌরবান্বিত করার সময়ে হিন্দুত্ববাদীরা সব ধরনের নির্বোধসূলভ কথা বলে থাকে। কিন্তু তারা এর কোন সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শগত ভিত্তি উপস্থিত করতে সক্ষম হয়নি। প্রকৃতপক্ষে এটি উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং ভারতের বড় বুর্জোয়া শ্রেণীর সেবায় নিবেদিত বিষাক্ত ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ ছাড়া আর কিছু নয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিজেপির নরেন্দ্র মোদী, আজকের ভারতে ধর্মের নামে একটি ফ্যাসিবাদী সরকার ব্যবস্থা পরিচালনা করছেন।

কংগ্রেস থেকে বিজেপি কোন দীর্ঘ লক্ষ নয়। এ হলো ধারাবাহিক এক পরিবর্তন।

অগাস্ট ১০, ২০২১

মূল ইংরেজী থেকে অনুবাদ: মুঈনুদ্দীন আহমদ

বদরুদ্দীন উমর
বদরুদ্দীন উমর
জন্ম ২০ ডিসেম্বর ১৯৩১, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর। পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, রাজনীতি, ও অর্থনীতি অধ্যয়ন করেন। ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগ দেন। বর্তমানে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Must Read

Role of street art in democratic struggle

গণতান্ত্রিক সংগ্রামে স্ট্রিট আর্ট বা রাস্তার চিত্রকলার ভূমিকা

ঢাকার দেয়ালে গ্রাফিতি- ‘ঠক! ঠক! ঠক!কে? -- স্যার একটু বাহিরে আসবেন?’ ‘ঠক! ঠক! ঠক!কে? -- তোরে বড় ভাই ডাকছে বাহিরে আয়!’ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাস থেকে শহরের দেয়ালে আঁকা...