Homeজাতীয়বদরুদ্দীন উমর বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে ১৯৭২ সালে যা লিখেছিলেন

বদরুদ্দীন উমর বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে ১৯৭২ সালে যা লিখেছিলেন

-

“সংবিধান কী? জনগণের অধিকার লিপিবদ্ধ করা এক কাগজ। এই অধিকারগুলো আসলেই স্বীকৃত হওয়ার নিশ্চয়তা কী? এই নিশ্চয়তা নিহিত রয়েছে জনগণের সেই সমস্ত শ্রেণীর শক্তির মধ্যে যারা সেই অধিকারগুলি সম্পর্কে সচেতন হয়েছে, এবং তা জয় করতে সক্ষম হয়েছে।”

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, Between Two Battles (Nov. 1905)

বদরুদ্দীন উমর বিভিন্ন সময়ে এটা বলেছেন যে, মার্কস-লেনিনের ছাত্র হিসেবে বরাবরই তিনি বাস্তব পরিস্থিতির বাস্তব বিশ্লেষণের চেষ্টা করেন। ১৯৭২ সালের শেষভাগে বাংলাদেশের খসড়া সংবিধান নিয়ে তিনি যে আলোচনা করেন তা থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে মতাদর্শিকভাবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের গভীরে তাঁর শেকড়। তাঁর লেখনি অত্যন্ত ক্ষুরধার এবং আজকের দিনে সেই পঞ্চাশ বছর আগের লেখা পাঠ করলে তাঁকে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বলেই মনে হবে।

বাংলাদেশের সংবিধান সভায় বিল আকারে উত্থাপিত খসড়া সংবিধান নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ১৯৭২ সালের ১৯ অক্টোবর এবং ১৫ দিনের মাথায় ৪ নভেম্বর তা গৃহীত হয়। এই সময়ে সংবিধান বিষয়ে মোট ছয়টি প্রবন্ধ লিখেন বদরুদ্দীন উমর। সকলের জ্ঞাতার্থে লেখাগুলির একটা তালিকা এখানে সংযুক্ত করছি (সাথে প্রকাশের তারিখ, পত্রিকার নাম ও যে গ্রন্থে গ্রন্থিত হয়েছে তার নাম)।

১. The Proposed Constitution – A Fundamental Measure Against Socialism, Democracy, Secularism and Nationalism (22.10.1972, Holiday, Politics and Society in Bangladesh)

২. A Constitution of Perpetual Emergency (29.10.1972, Holiday, Politics and Society in Bangladesh)

৩. আওয়ামী লীগ প্রস্তাবিত সংবিধান (২৯.১০.১৯৭২, সাপ্তাহিক স্বাধিকার, যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ)

৪. The Constitution and The People (7.11.1972, Holiday, Politics and Society in Bangladesh)

৫. আওয়ামী লীগের প্রতিশ্রুতি রক্ষা (১৯.১১.১৯৭২, সাপ্তাহিক স্বাধিকার, যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ)

৬. বাঙলাদেশের সংবিধান ও পরবর্তী নির্বাচন (২৬.১১.১৯৭২, সাপ্তাহিক স্বাধিকার, যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ)

বাংলাদেশের সংবিধান বিষয়ে বদরুদ্দীন উমরের প্রথমদিকের লেখাগুলির সাথে পাঠক, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মীদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় থাকা প্রয়োজন। এর মধ্য দিয়ে তিনি ও তাঁর নেতৃত্বধীন সংগঠন সমূহ কেন নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধানের জন্য লড়াই করছে এবং তাদের কর্মসূচীর লক্ষ্য অনেকখানি বোঝা যাবে।

এখানে শুধু প্রথম দুটি প্রবন্ধ নিয়ে আমরা আলোচনা করবো।

সংবিধান হলো একটি রাষ্ট্রের মৌলিক আইন যার কাঠামোর মধ্যে প্রণীত হয় অন্যান্য আইন। এটা একই সাথে আইনী অবকাঠামো ও আইনী ভারা। অন্য যে কোন আইনকেই এই কাঠামোর অন্তর্গত ও এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হয়, এর দ্বারা সীমাবদ্ধ ও নির্দেশিত হতে হয়। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার অর্থ তাই আইনের ধারাবাহিকতা। অন্যদিক থেকে দেখলে আইনের অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা সংবিধানের ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন। এমনকি শাসকদের জাতিগত চেহারা পাল্টে যাওয়া সত্ত্বেও এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে পারে। সংবিধানের ধারাবাহিকতা কোনো বংশগত বা জাতিগত শাসনের ধারাবাহিকতা নয়, এ হলো শ্রেণীগত শাসনের ধারাবাহিকতা, সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা ও পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা।

বদরুদ্দীন উমর তাঁর ‘বাঙলাদেশের শাসক শ্রেণী ও সংবিধান বিতর্ক’ শীর্ষক প্রবন্ধে সংবিধান প্রশ্নটি সহজ ভাষায় অল্পকথায় অতুলনীয়ভাবে আলোচনা করেছেন: “প্রাক-পুঁজিবাদী যুগে রাজা-বাদশারাই দেশ শাসন করতেন। কোন সংবিধানের অধীনে এই শাসন চলতো না। প্রত্যেক দেশের সমাজ ব্যবস্থায় রীতিনীতির সাথে শাসক রাজা-বাদশাদের দ্বারা নির্দিষ্ট ও প্রচলিত আইনকানুন যুক্ত তাদের নিজস্ব কিছু প্রচলিত নিয়মকানুন, রীতিনীতি ছিল। সেই নিয়মকানুন, হয়ে আইনের একটা কাঠামো থাকতো। সেই কাঠামোর অধীনেই রাজা-বাদশারা শাসন কাজ পরিচালনা করতেন। তবে আইনের এই কাঠামো এমন হতো না, যা রাজা-বাদশারা পবিত্র জ্ঞানে সব সময় মান্য করতেন। কাজেই এর লঙ্ঘন প্রায়ই ঘটতো, কারও ক্ষেত্রে কম, কারও ক্ষেত্রে বেশী। আইনের এই লঙ্ঘনকেই বলা হতো স্বেচ্ছাচারিতা (despotism)। এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা প্রাক-পুঁজিবাদী রাজা-বাদশাদের যুগে ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার।

“পুঁজিবাদের আবির্ভাব ও তার বিকাশ ঘটতে থাকার সাথে সাথে সমাজের সর্বক্ষেত্রে শৃংখলার প্রয়োজন বেশী করে দেখা দেয়। এই শৃংখলা রক্ষার জন্য প্রয়োজন হতে থাকে নোতুন নোতুন আইনকানুনের। স্বেচ্ছাচারী রাজা-বাদশারা ছিলেন সামন্তবাদী শাসক। সামন্তবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা ও তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে বিন্যস্ত সমাজ সম্পর্কের মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ থাকতো। এই স্বেচ্ছাচারিতার অর্থ বাস্তবতঃ ছিল রাষ্ট্রশক্তির অধিকারীদের জবাবদিহিতার কোন আইনগত ব্যবস্থা না থাকা, তাদের নিজেদের স্বার্থে জনগণের ওপর ইচ্ছেমত হামলা করা, তাদেরকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা, ব্যক্তি স্বাধীনতার বিকাশ রুদ্ধ করা।

“এই সমাজ কাঠামো ভেঙেই পুঁজিবাদ নিজের বিকাশ ঘটাতে শুরু করে। স্বেচ্ছাচারিতার অবসান এই বিকাশের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এর জন্য প্রয়োজন হয় জবাবদিহিতার এবং জবাবদিহিতার জন্য কার্যতঃ প্রয়োজন হয় এমন আইন যার দ্বারা সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্র শাসিত হবে, যাকে মান্য করে চলা সমাজে সকলের জন্যই হবে বাধ্যতামূলক। পুঁজিবাদের বিকাশের প্রক্রিয়ায় অনির্বাচিত রাজা-বাদশাদের ক্ষমতা কমে আসতে থাকে। ক্রমশঃ দেশের পর দেশে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ অথবা কার্যকরভাবে উচ্ছেদ হতে থাকে। রাজতন্ত্রই ছিল স্বেচ্ছাচারিতার সর্বোচ্চ রূপ। স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনেই শাসন ব্যবস্থায় উদ্ভব ঘটে শাসনতন্ত্র বা সংবিধানের।”

সামন্তবাদ থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণেরকালে ‘স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার’ যে প্রয়োজনের কথা বদরুদ্দীন উমর বলেছেন তা চিরস্থায়ী কিছু নয়। পুঁজিবাদের অধঃপতনের যুগে এসে সে প্রয়োজন পাল্টে গিয়ে সকল প্রকার জবাবদিহিতার উর্ধ্বে এক শাসনব্যবস্থা, ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার প্রয়োজন হয় শাসক শ্রেণীর। শাসনব্যবস্থা তখন হয়ে ওঠে বিদ্যমান সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, আবশ্যিকভাবেই তার মীমাংসা হয় বল প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। যেমন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের ‘নির্বাচন’ তাই কোন ভোটনির্ভর কাণ্ড ছিল না, ছিল পুরোপুরি বলপ্রয়োগের ব্যাপার।

“সংবিধান প্রণয়ন কোন খামখেয়ালী বা ছেলে খেলার ব্যাপার নয়। যেহেতু স্বেচ্ছাচারিতার অবসান সাংবিধানিক শাসনের প্রধানতম উদ্দেশ্য সে কারণে সংবিধান প্রণয়নের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি হলো, সরাসরি জনগণের ভোটের মাধ্যমে শুধু সংবিধান প্রণয়নের জন্যই একটি সংবিধান সভার নির্বাচন।”

বদরুদ্দীন উমর, ‘বাঙলাদেশের শাসক শ্রেণী ও সংবিধান বিতর্ক’ (সংস্কৃতি, অক্টোবর ২০১০)

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয় ১৯৭২ সালে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান হতে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্যদের নিয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান সভা। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ সংবিধান পরিষদ আদেশ জারি করেন এবং তা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকরী বলে ঘোষিত হয়। এই আদেশ বলে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত ৪৬৯-এর (জাতীয় পরিষদে ১৬৯ জন আর প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০ জন) মধ্যে ৪০৩ জন সদস্য নিয়ে বাংলাদেশের সংবিধান সভা গঠিত হয়। এটি ছিল একান্তভাবে আওয়ামী লীগ দলীয় সংবিধান সভা, কেননা তাতে ৩ জন বাদে সকলেই ছিলেন আওয়ামী লীগের সদস্য।

১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণাকালে আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বার বার বলেছিলেন যে, ছয় দফা ও এগারো দফার ভিত্তিতেই পাকিস্তানের নতুন সংবিধান তৈরী হবে। ছয় দফা ও এগারো দফার রাজনৈতিক মর্মবস্তু ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। জনগণও সেই ভিত্তিতেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট প্রদান করেছিলেন। সুতরাং, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন। এর মানে তাহলে দাঁড়াল এই যে, বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করেছে এমন এক সংবিধান সভা যা আদতে গঠিত হয়েছিল পাকিস্তানের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে।

উপর থেকে, রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে, এইভাবে গঠিত সংবিধান সভা ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট ‘খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করে। ১৭ এপ্রিল কমিটি জনগণের সকল অংশের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণের জন্য লিখিত প্রস্তাব আহ্বান করে যা ১৯৭২ সালের ৮ মের মধ্যে রেজিস্ট্রিকৃত ডাকযোগে পাঠাতে হবে। অর্থাৎ, খসড়ায় প্রস্তাব প্রদানের জন্য মাত্র ২১ দিন সময় দেয়া হয়।

খসড়া বিধানাবলী নিয়ে অনেকগুলো বৈঠকের পর ১৯৭২-এর ২৫ মে সংবিধানের একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রস্তুতের প্রশ্নে ‘খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ একমত হয় এবং ১০ দিনের মাথায় সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ খসড়া কমিটি বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। পর্যালোচনা শেষে ১০ জুন কমিটি কর্তৃক খসড়া সংবিধান অনুমোদিত হয়। তাহলে, ১১ এপ্রিল সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করার পর মাত্র দুই মাসের মাথায় সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ খসড়া কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হল।

পরবর্তী দুই মাস খসড়া সংবিধানের পাঠ আইনগত খসড়া রচনাকারী এবং বাংলা ভাষার পণ্ডিতদের দিয়ে পরিমার্জন শেষে খসড়া সংবিধানের একটি মার্জিত পাঠ ১০ আগস্ট কমিটি বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। কমিটি এরপর আরো দুই মাস সময় নিয়ে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত এই পাঠের পর্যালোচনা করে। ১২ অক্টোবর সংবিধান পরিষদে এটি বিল আকারে পেশ করা হয়।

দরকার ছিল জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও তাদের মতামত প্রদানের জন্য খসড়া সংবিধানটি লক্ষ লক্ষ সংখ্যায় ছেপে বিলি করা। দেশ জুড়ে সর্বস্তরে এ নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করা। কিন্তু তা না করে বিল পেশ করার পর কয়েক দিন ধরে জাতীয় দৈনিকগুলোতে ধারাবাহিকভাবে খসড়া সংবিধানের বিবরণ প্রকাশ করার ব্যবস্থা করা হয়। যদিও এ পর্যায়ে জনগণের মতামত প্রদানের কোন সুযোগ ছিল না।

১৯৭২ সালের ১৯ অক্টোবর সংবিধান সভায় সংবিধান বিষয়ে সাধারণ আলোচনা আরম্ভ হয় যা চলে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত, অর্থাৎ ছুটির দিনগুলি সহ মাত্র ১১ দিন। প্রথম পাঠ বা সাধারণ আলোচনার পর শুরু হয় দ্বিতীয় পাঠ বা দফাওয়ারী আলোচনা। এ পর্যায়ে সংবিধান সভা যেহেতু দফা ধরে ধরে আলোচনা করবে সুতরাং সময় লাগবে বেশী, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক ব্যাপারটি ঘটে নি। দফা ধরে ধরে দ্বিতীয় পাঠ শেষ হয় মাত্র দুই দিনে, ৩ ও ৪ নভেম্বর। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর ধ্বনি-ভোটে সংবিধান গৃহীত হয়।

দেখাই যাচ্ছে যে, বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় জনগণের কোনো প্রকার অংশগ্রহণ, প্রস্তাব প্রদান, মতামত প্রদান ও তা প্রতিফলন নিশ্চিতের কোনো সুযোগই রাখা হয় নি। আনুষ্ঠানিকভাবে দেখলে খসড়া প্রণয়ন কমিটি কর্তৃক সংবিধানের খসড়া রচনার আগে জনগণকে সংবিধান বিষয়ে কিছু আকাংখা প্রকাশের একটি সুযোগ দেয়া হয় মাত্র এবং সেটাও অল্প দিনের জন্য, কার্যত যার কোন মূল্য ছিল না।

এ বিষয়ে পরবর্তীকালে বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন: “… একটি সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রক্রিয়ায় রাজনীতির ক্ষেত্রে যে সব নোতুন শক্তির আবির্ভাব ঘটেছিল ও সংবিধান রচনার ক্ষেত্রেও তাদের যে প্রতিনিধিত্বমূলক ভূমিকার প্রয়োজন ছিল তার গুরুত্ব উপলব্ধি শেখ মুজিবের পক্ষে সম্ভব হয়নি।… কমিউনিস্ট নামধারী যে বামপন্থীরা আওয়ামী লীগের তল্পিবাহক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিলেন এ ব্যাপারে তাঁদেরও কোন উপলব্ধি ছিল না। কাজেই স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে সব নোতুন রাজনৈতিক উপাদান সংবিধান রচনাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অবদান রাখার কথা ও যাঁদের প্রতিনিধিত্বের জন্য পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংবিধান সভার নোতুন নির্বাচন দরকার ছিল তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে পাকিস্তানী জাতীয় সংসদকে দিয়ে ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাঙলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছিল। … এভাবে সংবিধান প্রণয়নের মধ্যে যে স্বেচ্ছাচারিতা ও দেউলিয়াপনা ছিল তার দ্বারাই বাঙলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে দেশে এক অরাজক ও সংকটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে ১৯৭৫ সালে আওয়ামী বাকশালী শাসনই উচ্ছেদ হয়েছিল।” (‘বাঙলাদেশের শাসক শ্রেণী ও সংবিধান বিতর্ক’)

আমরা এবার আমাদের মূল আলোচনায় যেতে পারি।

বদরুদ্দীন উমর ১৯৭২ সালের ২২ অক্টোবর লিখেন The Proposed Constitution A Fundamental Measure Against Socialism, Democracy, Secularism and Nationalism প্রবন্ধটি, যা প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক হলিডে-তে।

ও সংবিধানের প্রস্তাবনায় জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বদরুদ্দীন উমর তাঁর প্রথম প্রবন্ধে এই ঘোষণাকে নাকচ করে দিয়ে লিখেন যে, প্রস্তাবিত সংবিধান মৌলিকভাবেই এসবের বিরোধী।

সমাজতন্ত্রকে নীতি হিসেবে ঘোষণা ছিল এক মস্ত বড় ভাওতাবাজি। এ সম্পর্কে বদরুদ্দীন উমর লিখেন, “সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ১০ অনুচ্ছেদে একটি ‘পবিত্র’ ঘোষণা রয়েছে কিন্তু সংবিধানের কোথাও এমন কোনো ঘোষণা নেই যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত করা হবে। এমনকি একজন চরম মূর্খের কাছেও এটা স্পষ্ট যে ব্যক্তিগত সম্পত্তির সম্পূর্ণ বিলুপ্তির বিধান না করে যে কোনো সংবিধানে সমাজতন্ত্রের কোনো দাবি থাকতে পারে না। তাহলে খসড়া সংবিধানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির কী বিধান রাখা হয়েছে? অনুচ্ছেদ ১৩ অনুমোদন করেছে (ক) জাতীয়করণকৃত খাত, (খ) সমবায়ের কাঠামোর মধ্যে ব্যক্তিগত মালিকানা এবং (গ) সমস্ত ধরণের সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা। মালিকানার এই ঢককে ‘সমাজতান্ত্রিক’ চেহারা দেয়ার উদ্দেশ্যে একই অনুচ্ছেদে সাধারণভাবে বলা হয়েছে যে, যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদনের উপায়গুলির মালিকানা জনগণের। সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্য প্রকৃতপক্ষে যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে এ যেন ‘সবকিছুর মালিকানা ঈশ্বরের’ ঘোষণা করার মত ব্যাপার যেমনটি ছিল ১৯৫৬ সালের পাকিস্তানী সংবিধান এবং ১৯৬২ সালের কুখ্যাত আইয়ুব সংবিধানে।

“পূর্বে, পাকিস্তান আমলে, সমস্ত সম্পত্তি বিমূর্তভাবে ঈশ্বরের ছিল এবং প্রকৃতপক্ষে ‘ঈশ্বরের বান্দারা’ মেহনতি জনগণের শ্রমের ফল শোষণ ও আত্মসাৎ করত। এখানেও খসড়া সংবিধানে সাধারণ এবং বিমূর্ত পদ্ধতিতে যন্ত্রপাতি ও উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা জনগণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সম্পত্তির সম্প্রসারণ এবং জনগণকে শোষণের জন্য শাসক শ্রেণী তথা ‘জনগণের সেবকদের’ বিশাল সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। এইভাবে ১৩ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ব্যক্তিগত সম্পত্তি সম্পর্কিত অবস্থানটি ৪২ অনুচ্ছেদে আরও জোরদার করা হয়েছে এই বলে যে, আইনী সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে, প্রতিটি নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর এবং বণ্টন করার অধিকার থাকবে।”

৪২ অনুচ্ছেদে যে ‘আইনী সীমাবদ্ধতা’র কথা বলা হয়েছে এটি ছিল আরেক চালাকি। উমর লিখেছেন, “এই আইনী বিধিনিষেধগুলি, অন্যত্র উল্লিখিত অন্যান্য সমস্ত বিধিনিষেধের মতো, সংসদ বা রাষ্ট্রপতির দ্বারা বা পরিস্থিতি অনুসারে সরকারের একটি অধ্যাদেশ বা বিজ্ঞপ্তি দ্বারা আরোপ করা যেতে পারে। তবে এর থেকেও যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল ব্যক্তিগত সম্পত্তি সীমাবদ্ধ করার ক্ষেত্রে এগুলি আদৌ চাপিয়ে দেয়া হবে না। বরং আইনগুলি এমনভাবে প্রণয়ন করা যেতে পারে যাতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং বিদেশী বিনিয়োগের সম্প্রসারণ এবং একীভবন সহজতর হয়। খসড়া সংবিধানে এমন কিছু নেই যা সরকারকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে বিরত রাখতে পারে।”

সমাজতন্ত্রের জন্য আবশ্যিক ভূমি সংস্কার সম্পর্কে সংবিধানে কিছুই ছিল না। উমর তার উল্লেখ করে বলেন যে, খসড়া সংবিধানে ‘কৃষি বিপ্লব’, ‘শ্রমিক ও কৃষকের মুক্তি’ ইত্যাদি জমকালো সব কথাবার্তা থাকলেও সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ক সমূহ ও জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার বিলুপ্তি বা ভূমি ব্যবস্থায় মৌলিক কোন পরিবর্তনের কথা সেখানে নেই। সুতরাং, কৃষকের অধিকার ও কল্যাণের ঘোষণা (অনুচ্ছেদ ১৪-১৬) রাজনৈতিক প্রচারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার তখনো এক বছর পূর্ণ হয় নি, ইতিমধ্যেই আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রীয়করণ নীতি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে উল্লেখ করে উমর বলেন যে, শিগগীরিই তা ব্যক্তিখাত দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় বৃহৎ কর্পোরেশনের ছায়া বাংলাদেশে পড়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় তা বাস্তবায়িত হবে।

উমর বলেন, “প্রস্তাবিত সংবিধান কোন জাতেরই সমাজতান্ত্রিক সংবিধান নয়, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ চিলি থেকে ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত সমগ্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঠিক যে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করছে এই সংবিধান তার ব্যবস্থাই করছে। মার্কিন পুঁজির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক বৈরিতা শুধু থমকেই দাঁড়ায় নি, সরকার ক্রমশ নমনীয় হয়ে উঠছে। যে গতিতে এই পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে তা যদি বজায় রাখা হয় তবে অদূর ভবিষ্যতে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির একটি বড় অংশ ব্যক্তিগত হাতে হস্তান্তর করা হবে এবং বিদেশী বিনিয়োগের জন্য নতুন আইন জারি করা হবে।

সামাজ্যবাদী পুঁজির দরজা এভাবেই উন্মুক্ত হয়ে যাবে।”

বদরুদ্দীন উমরের সিদ্ধান্ত হলো, বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী ও তার সরকার সামাজ্যবাদী পুঁজির জন্য শিগগীরিই দরজা উন্মুক্ত করবে, সংবিধানে সেই ব্যবস্থাই রাখা হয়েছে যা জাতীয় স্বাধীনতার সাথে কোনভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস সময়কালে জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রাম একটি সত্যিকারের জাতীয় চরিত্র অর্জন করেছিল কারণ এটি মূলত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চরিত্র অর্জন করেছিল। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির প্রবাহের ফলে বাংলাদেশ সরকারের চরিত্রে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে বাধ্য। আর এমন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে -“সরকার নিজেই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় দেশবিরোধী উপাদান। জাতীয় স্বাধীনতা ও সম্মান রক্ষার পতাকা তখন সরকার নয়, আমাদের দেশের সংগ্রামী জনগণের হাতে সমুন্নত থাকবে।”

বদরুদ্দীন উমর বলেন, “খসড়া সংবিধান সেই সম্ভাবনা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন বলেই মনে হয় এবং তা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত বিধানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবং এখানেই আমরা তৃতীয় মৌলিক নীতি গণতন্ত্রের ধ্বংস দেখতে পাই।”

খসড়া সংবিধান কিভাবে গণতন্ত্র বিরোধী সে বিষয়ে বদরুদ্দীন উমর বলেন,

“অনুচ্ছেদ ৬৩(৩)-এ অত্যন্ত চতুরতার সাথে একটি অত্যন্ত অসাধারণ বিধান সন্নিবেশ করা হয়েছে। যুদ্ধ, আগ্রাসন এবং সশস্ত্র বিদ্রোহকে একত্রিত করে এই অনুচ্ছেদে বিধান করা হয়েছে যে, জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য সংসদ যে কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারবে এবং সংবিধানের অন্য কোন বিধান কোনোভাবেই এমন আইন প্রণয়ন করা থেকে সংসদকে বিরত রাখতে পারবে না। অর্থাৎ, এমন পরিস্থিতিতে সংবিধান কার্যত স্থগিত হয়ে যাবে। এমন সংবিধানের কথা কে শুনেছে?”

সশস্ত্র বিদ্রোহের সংজ্ঞা এবং কখন এটি জাতীয় জরুরী পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে

এর মাত্রাগত বর্ণনার অনুপস্থিতিতে ৬৩ (৩) অনুচ্ছেদ সরকারের হাতে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে যে কোনো রাজনৈতিক বিরোধিতাকে চরম নির্মমতার সাথে দমন করার। যখনই সরকারের স্বার্থ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে, তখনই তারা জননিরাপত্তার নামে আইন প্রণয়ন করতে সক্ষম হবে এবং বিরোধীদের ইচ্ছেমত দমন করবে। এবং এই বিরোধিতার পরিধির মধ্যে ব্যক্তি কর্তৃক সরকারের বিরোধিতা থেকে শুরু করে জনগণের অভ্যুত্থান পর্যন্ত সব কিছু অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

করার চেষ্টা করছে এই সংবিধান তার ব্যবস্থাই করছে। মার্কিন পুঁজির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক বৈরিতা শুধু থমকেই দাঁড়ায় নি, সরকার ক্রমশ নমনীয় হয়ে উঠছে। যে গতিতে এই পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে তা যদি বজায় রাখা হয় তবে অদূর ভবিষ্যতে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির একটি বড় অংশ ব্যক্তিগত হাতে হস্তান্তর করা হবে এবং বিদেশী বিনিয়োগের জন্য নতুন আইন জারি করা হবে।

সামাজ্যবাদী পুঁজির দরজা এভাবেই উন্মুক্ত হয়ে যাবে।”

বদরুদ্দীন উমরের সিদ্ধান্ত হলো, বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী ও তার সরকার সামাজ্যবাদী পুঁজির জন্য শিগগীরিই দরজা উন্মুক্ত করবে, সংবিধানে সেই ব্যবস্থাই রাখা হয়েছে যা জাতীয় স্বাধীনতার সাথে কোনভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস সময়কালে জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রাম একটি সত্যিকারের জাতীয় চরিত্র অর্জন করেছিল কারণ এটি মূলত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চরিত্র অর্জন করেছিল। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির প্রবাহের ফলে বাংলাদেশ সরকারের চরিত্রে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে বাধ্য। আর এমন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে -“সরকার নিজেই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় দেশবিরোধী উপাদান। জাতীয় স্বাধীনতা ও সম্মান রক্ষার পতাকা তখন সরকার নয়, আমাদের দেশের সংগ্রামী জনগণের হাতে সমুন্নত থাকবে।”

বদরুদ্দীন উমর বলেন, “খসড়া সংবিধান সেই সম্ভাবনা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন বলেই মনে হয় এবং তা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত বিধানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবং এখানেই আমরা তৃতীয় মৌলিক নীতি গণতন্ত্রের ধ্বংস দেখতে পাই।”

খসড়া সংবিধান কিভাবে গণতন্ত্র বিরোধী সে বিষয়ে বদরুদ্দীন উমর বলেন,

“অনুচ্ছেদ ৬৩(৩)-এ অত্যন্ত চতুরতার সাথে একটি অত্যন্ত অসাধারণ বিধান সন্নিবেশ করা হয়েছে। যুদ্ধ, আগ্রাসন এবং সশস্ত্র বিদ্রোহকে একত্রিত করে এই অনুচ্ছেদে বিধান করা হয়েছে যে, জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য সংসদ যে কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারবে এবং সংবিধানের অন্য কোন বিধান কোনোভাবেই এমন আইন প্রণয়ন করা থেকে সংসদকে বিরত রাখতে পারবে না। অর্থাৎ, এমন পরিস্থিতিতে সংবিধান কার্যত স্থগিত হয়ে যাবে। এমন সংবিধানের কথা কে শুনেছে?”

সশস্ত্র বিদ্রোহের সংজ্ঞা এবং কখন এটি জাতীয় জরুরী পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে

এর মাত্রাগত বর্ণনার অনুপস্থিতিতে ৬৩ (৩) অনুচ্ছেদ সরকারের হাতে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে যে কোনো রাজনৈতিক বিরোধিতাকে চরম নির্মমতার সাথে দমন করার। যখনই সরকারের স্বার্থ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে, তখনই তারা জননিরাপত্তার নামে আইন প্রণয়ন করতে সক্ষম হবে এবং বিরোধীদের ইচ্ছেমত দমন করবে। এবং এই বিরোধিতার পরিধির মধ্যে ব্যক্তি কর্তৃক সরকারের বিরোধিতা থেকে শুরু করে জনগণের অভ্যুত্থান পর্যন্ত সব কিছু অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

বস্তুতঃ সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে নীতি হিসেবে গণতন্ত্রকে পুরোপুরিভাবে নাকচ করে দেয়া হয়।

সংবিধানের ৩৫, ৩৬, ৩৭ ও ৩৮ অনুচ্ছেদে জনগণকে নানা ধরনের গণতান্ত্রিক অধিকার দেয়া হলেও তা আবার তুলে নেয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে সেই আলোচনা করে বদরুদ্দীন উমর বলেন, “খসড়া সংবিধানের প্রাথমিক বিশ্লেষণ থেকে এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশে আইনের শাসনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আওয়ামী লীগ সরকার জঙ্গলের শাসন জারি করার চেষ্টা করছে যেখানে জনগণ নয়, সরকার নিজেই রাজনৈতিক নৈরাজ্য ছড়িয়ে দেয়ার প্রধান কর্তা।”

বদরুদ্দীন উমরের মতে, প্রস্তাবিত সংবিধান বাংলাদেশে কোন রাজনৈতিক গণতন্ত্র নয় বরং নৈরাজ্যিক এক ব্যবস্থা বা জঙ্গলের শাসনের আইনী ভিত্তি দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার কী হবে?

বদরুদ্দীন উমর বলেন, “ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে যদি বোঝানো হয় যে বাংলাদেশ সরকার এই রাষ্ট্রকে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করবে না, তাহলে অবশ্যই বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রই থাকবে। কারণ ভবিষ্যতে কেউ, এমনকি শোষক শ্রেণীও এই ঘোষণার মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে বা অন্যভাবে কিছু লাভকরতে পারবে না। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে যদি বোঝানো হয় যে সরকার ধর্মের কোনো রাজনৈতিক ব্যবহার করবে না (ধারা ১২ গ) তাহলে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থাকবে না।”

তার কারণ, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার সামাজিক ভিত্তি ধ্বংসের পরও তা টিকে আছে উপরিকাঠামোর স্তরে এবং যে সরকার নাগরিকদের অন্য কোনো মৌলিক অধিকারের প্রতি সামান্যতম গুরুত্ব দেয় না, সে জনগণের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা থেকে বিরত থাকার মত গণতান্ত্রিক হতে পারে না।

উমর তাই বলেন, “বর্তমান সরকারের ধর্মনিরপেক্ষতা অবশ্যই রাজনৈতিক জীবন থেকে ধর্মের অপসারণ করার চেষ্টা নয়, বরং সকল ধর্মের সমস্ত ধরণের ধর্মীয় অনুশীলনকে উৎসাহিত করা ও বাঁচিয়ে রাখা, এবং পরিস্থিতির অনুযায়ী একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চালিত করা। যেহেতু এই ধরনের তৎপরতা কখনই আইনগতভাবে এবং প্রকাশ্যে করা হয় না সেগুলি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এবং গোপনে করা হবে। কিন্তু সর্বোপরি সংবিধানে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে যেখানে কেবল ক্ষমতায় থাকা সরকারই নয়, বিরোধী দলের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক উপাদানও গোপনে ও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কাজ করার চেষ্টা করবে যখন এর দ্বারা তাদের জন্য স্বার্থ হাসিল হবে।”

8

“আধুনিক রাষ্ট্রের নির্বাহী সমগ্র বুর্জোয়াদের সাধারণ বিষয়গুলি পরিচালনার জন্য একটি কমিটি মাত্র।”

মার্কস-এঙ্গেলস, কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার

বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে লেখা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি হলো বদরুদ্দীন উমরের A Constitution of Perpetual Emergency। এটিও প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক হলিডে-তে, ২৯ অক্টোবর ১৯৭২ সালে। সংবিধান সভায় তখন খসড়া সংবিধানের প্রথম পাঠ চলছে।

প্রবন্ধের শুরুতেই বদরুদ্দীন উমর বলেন যে, খসড়া সংবিধানে সমাজে বিরাজমান টানপোড়েন ও চাপা উত্তেজনার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। এটিকে ‘আমাদের জনগণের পরিত্রাণের’ দলিল হিসাবে দেখা অর্থহীন। শাসক শ্রেণীর মৌলিক অনুমান ও ধারণা সমূহ এবং তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য খুঁজে দেখার জন্য এর মনোযোগী পাঠ প্রয়োজন।

সমগ্র সংবিধান জুড়ে যে মৌলিক ধারণাটি বিরাজ করছে তা হলো আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাস। অবিশ্বাসের শুরু ব্যক্তিকে দিয়ে, বিশেষ করে যারা শোষক ব্যতীত অন্য শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এই কারণেই তারা কার্যত সকল মৌলিক অধিকারকে বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত বহির্ভূত করেছে (unjusticiable), সোজা কথায় সকল মৌলিক অধিকারকে কার্যত অস্বীকার করেছে। এর মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গণতান্ত্রিক জীবনের অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান আইন আদালতে তাদের অবিশ্বাসকে উন্মোচিত করেছে।

সংবিধানে মৌলিক অধিকারের উল্লেখ রয়েছে এমন প্রতিটি ক্ষেত্রে আইন আদালতের প্রতি আওয়ামী লীগ সরকারের অবিশ্বাস দেখা যাবে। কোন মৌলিক অধিকার উল্লেখ করার সাথে সাথেই সংবিধানের ‘লঙ্ঘন না করে’ তা কেড়ে নেয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা সংবিধানেই রয়েছে। অন্য কথায়, বাংলাদেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ‘সাংবিধানিকভাবে লঙ্ঘন’ করার জন্য সংবিধানে পর্যাপ্ত বিধান করা হয়েছে। সরকার ও রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ব্যক্তির মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে আদালতে যাওয়ার পথ সংবিধানে রুদ্ধ করা হয়েছে।

এর কারণ নিহিত রয়েছে নবীন বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর শ্রেণীচরিত্রের মধ্যে।

উমর বলেন, এটা সত্য যে আদালতের বিচার যে সমাজে আদালত কাজ করে সেই সমাজের চরিত্র ছাড়িয়ে উপরে উঠতে পারে না। পাকিস্তানকে প্রতিস্থাপিত করেছে যে বাংলাদেশ তার শাসক শ্রেণীগুলি তাদের নিজস্ব আইন আদালতের উপর নির্ভর করতে পারে না, তারা নাগরিকদের এমন অধিকারও দিতে পারে না যা তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ‘মূলত বিরোধী’ নয়। সমস্ত অনুন্নত এবং নিদারুনভাবে শ্রেণী-বিভক্ত সমাজের এটি এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

উন্নত পুঁজিবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিপক্কতার কারণে এবং উন্নততরভাবে সংগঠিত শোষণ ব্যবস্থার কারণে অনেক ধাক্কা সহ্য করতে পারে। কিন্তু ‘অনুন্নত শাসক শ্রেণী’ তা করতে পারে না। কেননা শোষক হিসেবে তারা উপযুক্তভাবে সংগঠিত নয়। তাদের রাজনৈতিক সংগঠন, তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা, তাদের আইন আদালত শোষণ প্রক্রিয়ার সাথে দৃঢ়ভাবে সমন্বিত নয়। এই কারণেই বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী তাদের নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলিকে অবিশ্বাস করছে এবং সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছে তাদের সর্বাপেক্ষা সংগঠিত প্রতিনিধি, তাদের রাজনৈতিক দলের হাতে।

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে মর্কিস-এঙ্গেলস বলেছিলেন, “আধুনিক রাষ্ট্রের নির্বাহী সমগ্র বুর্জোয়াদের সাধারণ বিষয়গুলি পরিচালনার জন্য একটি কমিটি মাত্র।” বাংলাদেশে যা ঘটলো তা হলো আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রের নির্বাহী হিসেবে থাকাটা যথেষ্ট মনে করলো না, সে নিজেই হয়ে উঠতে চাইল রাষ্ট্রের সমগ্র সংগঠন।

উমর উল্লেখ করেন যে, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও রাজনৈতিক দলের হাতে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে, যতদিন না সর্বহারা শ্রেণী সমগ্র সমাজ জুড়ে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় ও সংহত করছে। আর বাংলাদেশে সামন্ত-বুর্জোয়া শ্রেণী তাদের জন্য ‘সুবিধাজনক’ সংবিধান প্রণয়ন করে নিজ শ্রেণীস্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে।

A Constitution of Perpetual Emergency প্রবন্ধে এই প্রারম্ভিক আলোচনার পর বদরুদ্দীন উমর খসড়া সংবিধান নিয়ে তাঁর মূল আলোচনাটি করেন।

প্রবন্ধটি থেকে আমরা দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিব: “অনুচ্ছেদ ৫৫(৪-৬) এ বলা হয়েছে যে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রণীত কিছু নিয়ম অনুসারে সরকারের পক্ষে নির্বাহী আদেশ জারি করার জন্য রাষ্ট্রপতি হবেন সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে আইন আদালতে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না। যেহেতু সর্বদাই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতিকে প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন সহ সবকিছু করতে হবে, (অনুচ্ছেদ ৪৮, উপ-ধারা ৩) চূড়ান্ত বিশ্লেষণে রাষ্ট্রপতি নন প্রধানমন্ত্রীই এটি করছেন, যিনি তার নির্বাহী কাজ সম্পাদনকালে আইন আদালতের নাগালের বাইরে থাকবেন। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে, যার নেতা প্রধানমন্ত্রী। সে হিসেবে সমগ্র প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণ হবে স্বেচ্ছাচারী এবং সম্পূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার পরিধি আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাবে এটা হিসেবে নিলে যে, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত প্রধান বিচারপতি বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত প্রার্থী। প্রকৃতপক্ষে, এমন ক্ষমতাহীন রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের সাথে সম্পর্কিত সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করবেন।

“সংসদীয় ব্যবস্থায় দৃশ্যত এতে দোষের কিছু নেই। কারণ এই ধরনের ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীই সরকারের সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। যা এটিকে সত্যিই ব্যতিক্রমী করে তোলে তা হল ‘আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া’ হিসাবে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। এই সংবিধানে আইন আদালত কার্যত সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের অধঃপতিত এক ভৃত্যে রূপান্তরিত হয়েছে। পরিস্থিতি সত্যিই অসাধারণ হয়ে ওঠে যখন কেউ এই সবের পাশাপাশি খসড়ার ৭০ অনুচ্ছেদে এসে হোঁচট খান।

“খসড়া সংবিধান অন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বা ক্ষমতায় থাকা সরকারের সম্পূর্ণ অধীনস্থ করেছে। সকল ব্যক্তির অধিকার এবং সকল প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের উপর নির্ভরশীল করা হয়েছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কী হবে? ৭০ অনুচ্ছেদে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের চিঠিই যে কোনো সংসদ সদস্যের সদস্যপদ বাতিল করার জন্য যথেষ্ট হবে। এর মধ্যদিয়ে সংসদীয় দলের সীমার মধ্যেও সদস্যদের স্বাধীনতা নষ্ট করা হয়েছে। এই দলটির নেতাই সংসদীয় নেতা (বর্তমান খসড়া থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে এই দুইয়ের পৃথকীকরণের কথা ভাবা হয় নি) যার কাছে এই অনুচ্ছেদ অনুসারে সমস্ত ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছে। তার বরাতে বাকি সবাই পুতুলমাত্র। সে হিসেবে, সংসদ একটি রাবার স্ট্যাম্প ছাড়া আর কিছুই নয়, প্রধানমন্ত্রীর সকল ইচ্ছায় আনুষ্ঠানিকতার সীলমোহর দেয়া হবে যার কাজ।”

উমরের পর্যবেক্ষণ এই যে, সংবিধান রাষ্ট্রের সকল মৌলিক (basic) প্রতিষ্ঠানের প্রতি শাসক শ্রেণীর চরম অবিশ্বাস নির্দেশ করছে এবং সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাহায্যে সেগুলি নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৭০ ইঙ্গিত করে যে এমনকি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপরও নির্ভর করা চলে না। সংসদীয় দলকে করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ হাতিয়ারে, যিনি শাসক শ্রেণীর একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশে সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী।

উমরের সিদ্ধান্ত, সংবিধান এটাই অনুমোদন করছে যে প্রধানমন্ত্রী কার্যত হবেন একজন স্বৈরশাসক।

বদরুদ্দীন উমর এরপর ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মত বলেন, “খসড়া সংবিধান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীগুলি বর্তমানে ভয়ানকভাবে অসংহত। শুধু তাই নয়। তারা অসংখ্য অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জর্জরিত। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলি সমগ্র সমাজের মধ্যে উপলব্ধিযোগ্য টানপোড়েন তৈরি করেছে এবং শাসক শ্রেণী নিজেরাও জানে না কিভাবে এর সমাধান করা যায়। এমনকি বলপ্রয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলিও টানপোড়েন ও চাপা উত্তেজনা থেকে মুক্ত নয়। এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে পুরো ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস বলে মনে হচ্ছে। এ কারণেই, তাদের বিভিন্ন আপত্তি সত্ত্বেও, চূড়ান্ত বিশেষণে, শাসক শ্রেণী তাঁর উপর আস্থা রাখতে বাধ্য, অন্য কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে উপর নয়। এবং সে জন্যই শাসক শ্রেণীর একনায়কত্ব প্রধানমন্ত্রীর, এক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের, সংসদীয় একনায়কত্বের রূপ নিতে চাইছে। শেখ মুজিবুর একজন বেসামরিক ব্যক্তি হওয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ে এই একনায়কত্ব সংসদীয় রূপ নিয়েছে। আগামীতে পরিস্থিতি বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এবং শাসক শ্রেণীর জন্য পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে সংসদীয় শাসন রাষ্ট্রপতির শাসন দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে পারে, বা আরও খারাপ কিছু হতে পারে।”

বদরুদ্দীন উমর বলেন যে, আমাদের সমাজ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংবিধানে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। বাংলাদেশে ‘চিরস্থায়ী’ জরুরী অবস্থা বহাল থাকবে ধরে নিয়ে সংবিধান রচনা করা হয়েছে এবং শাসক শ্রেণীকে তদনুযায়ী সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে জরুরী ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এসব হলো ১৯৭২ সালের পর্যবেক্ষণ। আমরা জানি এর সোয়া দুই বছরের মাথাতেই কিভাবে সংবিধান সংশোধন করে সংসদের ভিতরে বাইরে সকল দলগুলিকে নিষিদ্ধ করে একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রপতির শাসন কায়েম করা হয়। এবং তার অল্পদিন পর বেসামরিক শাসন উচ্ছেদ হয়ে সামরিক শাসন কায়েম হয়।

হাসিবুর রহমান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Must Read

Communalism in India

ভারতে সাম্প্রদায়িকতা

শেখ হাসিনার শাসন আমলে নরেন্দ্র মোদির ভারত সরকার বাঙলাদেশকে মনে করতো তার আশ্রিত রাষ্ট্র। তার আগেও ভারত-বাঙলাদেশ রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য ছিল না, কিন্তু...