Homeমতামতশিক্ষা আন্দোলনের শ্রেণী প্রশ্নে

শিক্ষা আন্দোলনের শ্রেণী প্রশ্নে

-

শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে যে কোন আলোচনা অথবা আন্দোলন মতাদর্শ যেহেতু কোন না কোন শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে ফলে যেকোন দেশের কোন না কোন শ্রেণীর রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা, এই শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার বা একেবারে পালটে ফেলার আন্দোলনের কর্মসূচীর মধ্যে কোন না কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ তথা কোন না কোন শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিফলন ঘটে। তাই যেকোন দেশের শিক্ষা ও শিক্ষা আন্দোলন সংক্রান্ত যেকোন আলোচনা শ্রেণী প্রশ্নকে বাদ দিয়ে করা অবাস্তব এবং অনৈতিহাসিক।

কিন্তু এই অনৈতিহাসিক, অবাস্তব এবং পেটি বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গীরই প্রাধান্য বাংলাদেশের প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর শিক্ষা আন্দোলনের মধ্যে দেখা যায়। এই বিষয়টিই কমরেড বদরুদ্দীন উমর তাঁর ‘শিক্ষা ও শিক্ষা আন্দোলন’ শীর্ষক গ্রন্থের প্রবন্ধগুলোতে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন।

বাংলাদেশে শিক্ষা আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দেখা যাবে এই শিক্ষা আন্দোলনের একটি শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গী আছে। কি সেই শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গী, তা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কমরেড বদরুদ্দীন উমর তাঁর ‘শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য’ (সংস্কৃতি, ডিসেম্বর ১৯৯৯ সংখ্যায় প্রকাশিত) প্রবন্ধে বলেছেন,

বাংলাদেশে এখন শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য নিয়ে কিছু আলোচনা, ছোটখাটো আন্দোলন, দাবী দাওয়া পেশ ইত্যাদি হয়ে থাকে। এই আলোচনা, আন্দোলন ও দাবী দাওয়ার প্রতি লক্ষ্য রাখলে দেখা যাবে এগুলির খুব স্পষ্ট শ্রেণী চরিত্র আছে। সাধারণ বুদ্ধিজীবী হোমড়া চোমড়া শিক্ষাবিদ থেকে নিয়ে ছাত্র সংগঠন পর্যন্ত প্রায় সকলেই বৈষম্যের ব্যাপারে উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মধ্যেই নিজেদের বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেন।

এইসব ক্ষেত্রে বৈষম্য অবশ্যই আছে এবং এই বৈষম্যের মাধ্যমে এ দেশে একটি বিশেষ সুবিধাভোগী ‘উচ্চ’ শ্রেণী গঠন ও তার শিক্ষাগত বুনিয়াদ পাকা করারই ব্যবস্থা হয়। তবে এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার যে, এই বৈষম্য আবার হল সামগ্রিকভাবে এ দেশের সুবিধাভোগী নোতুন বুর্জোয়া শ্রেণীর কাঠামোর মধ্যেকার একটি ব্যাপার। এই বৈষম্যের সাথে দেশের কোটি কোটি ছেলেমেয়ের জীবন ও শিক্ষার কোন সম্পর্ক নেই। এই সম্পর্কহীনতার মূল কারণ, শিক্ষা ক্ষেত্রে যত প্রকার বৈষম্য আছে তার মধ্যে সব থেকে বড় বৈষম্য হলো একদিকে সুবিধাপ্রাপ্ত অতি অল্প সংখ্যকের উচ্চতম শিক্ষা ও অন্যদিকে কোটি কোটি ছেলেমেয়ের নিরক্ষরতা অথবা নামকাওয়াস্তে প্রাথমিক শিক্ষা।’ (শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য)

২২ বছর আগে বাংলাদেশের শিক্ষা আন্দোলনের শ্রেণীচরিত্র নিয়ে কমরেড বদরুদ্দীন উমর যে কথাগুলো বলেছেন সেই কথাগুলো বিস্ময়কর এবং দুঃখজনকভাবে এখনো বাংলাদেশের শিক্ষা আন্দোলনের বাস্তবতা।

আমরা যদি শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন থেকে ২০১৭ পর্যন্ত বাংলাদেশের শিক্ষা আন্দোলনগুলো ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে খুব পরিষ্কারভাবে বদরুদ্দীন উমর উল্লেখিত শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গীর বিষয়টি ফুটে উঠবে।

২০১০ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাৎসরিক উন্নয়ন ফি চারগুণ বৃদ্ধির বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন হয়েছিল। সেই আন্দোলনের ব্যাপকতা এবং জঙ্গীত্ব চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। এই কারণে যে, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে চট্টগ্রাম শহর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। ছাত্রদের আন্দোলনকে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাপকভাবে লাঠিপেটা করে দমন করে। শত শত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এর ঠিক পরের বছরই ২০১১ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন আইন (২০০৫) এর ২৭/৪ ধারার বিরোধিতা করে আরেকটি জঙ্গী আন্দোলন করে। সেই আন্দোলনে ছাত্ররা ব্যাপকভাবে নেমে এসেছিল ঢাকার রাস্তায়। এই আইন আনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই সকল অর্থের সংস্থান করতে হয়, অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের উচ্চমূল্যে শিক্ষা কিনতে হবে। ন্যাক্কারজনক এই আইনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভকে সরকার দমন করতে ব্যর্থ হয় এবং সংশ্লিষ্ট আইনটি স্থগিত ঘোষণা করে। এই দুইটি উল্ল্যেখযোগ্য আন্দোলনের বাইরেও এই সময়কাল জুড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্যবিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন হয়েছে।

২০০৬ সালে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় গৃহীত দীর্ঘমেয়াদি কৌশলপত্রের আওতাতেই বছর বছর শিক্ষার্থীদের উপর এই অযৌক্তিক ফি চাপিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্বব্যাংকের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে ২০০৬-২০২৬ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদে উচ্চশিক্ষায় এক কৌশলপত্র হাজির করে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারি অনুদানে নয়, নিজস্ব অর্থায়নে বাজেট প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে ২০০৬ সাল থেকেই বিচ্ছিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন নানা মাত্রায় আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছে। সাম্রাজ্যবাদী এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের ন্যায্যতা রয়েছে নিশ্চয়ই।

কিন্তু দেখা যাবে একই সময় মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে সেই প্রশ্নে ছাত্র সংগঠনগুলোর সেই মাত্রায় কোন আন্দোলন আলোচনা বা কর্মসূচী দেখা যাচ্ছেনা। অথচ এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্ক প্রণীত SESDP (Secondary Education System Development Project) এর মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষা সংকোচনের আয়োজন চলছে বেশ অনেকদিন ধরে। এখন সেটি SESIP (Secondary Education System Investment Project) নামে শিক্ষা ক্ষেত্রে গরীব মানুষের সন্তানদের প্রবেশগম্যতা পুরোপুরি বন্ধ করবে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় তথাকথিত সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সমাপনী পরীক্ষা চালু করার পর থেকে শিক্ষা ব্যয় বাড়ছে লাগামহীনভাবে। ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ সালে কালেরকণ্ঠ প্রকাশিত এক রিপোর্ট থেকে দেখা যায় বিদ্যালয়ের বাইরে কোচিং-এর পেছনে ব্যয় মোট শিক্ষাব্যয়ের ৭৫%। ২০ অগাস্ট ২০১৫তে বেসরকারী সংস্থার মোর্চার গণস্বাক্ষরতা অভিযানের এক প্রতিবেদনের উপর প্রথমআলোতে প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোচিং বেআইনি হলেও ২০০৯ সাল থেকে পঞ্চম শ্রেণী পড়া শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সমাপনী পরীক্ষা চালুর পর থেকে কোচিং বাড়ছে। ২০০০ সালে ৩৯.৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে এই শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা কোচিং করত। ২০১৫তে এটি বেড়ে হয়েছে ৮৬.৩ শতাংশ। ৭৮ শতাংশ সরকারি বিদ্যালয়ে কোচিং ছিল বাধ্যতামূলক। এতে শিক্ষার্থীদের ব্যয়ও বেড়েছে। এই পরীক্ষার জন্য প্রাইভেট পড়ার নির্ভরশীলতা বাড়ছে, পাঠ্যবইকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে গাইডবই। উপরোক্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পাসের হার বাড়াতে খাতায় নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া, প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা অনিয়ম হচ্ছে। পরীক্ষার হলে দেখাদেখি করে লেখা এবং উত্তরপত্র মেলানোর জন্য শেষের ৪০ থেকে ৬০ মিনিট অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যালয়গুলো বছরে গড়ে ৪১২ ঘণ্টা কোচিং করায়। আর ৪৪ শতাংশ বিদ্যালয়ের সব শিক্ষকই কোচিংয়ে পড়ান। কোচিংয়ের পাশাপাশি ৬৩ শতাংশ বিদ্যালয় নিজ উদ্যোগে মডেল টেস্টের আয়োজন করে। আবার জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা অনুসরণ করে পরীক্ষকেরা উদারভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেছেন। শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদসহ কয়েকজন শিক্ষক, অভিভাবক ও বক্তা এই পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানান।

গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষায় সব শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারত না। এই বৈষম্য দূর করার কথা বলে সমাপনী পরীক্ষা চালু করা হয়। কিন্তু এই পরীক্ষার নামে আরও বৈষম্য করা হচ্ছে কি না, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিবন্ধন ফি ৬০ টাকা হলেও ৩৪.৩ শতাংশ পরীক্ষার্থীকে এর চেয়ে বেশি টাকা দিতে হয়, যা সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা পর্যন্ত।

নিবন্ধনের সময়ই ‘দুর্বল’ পরীক্ষার্থীদের ‘সবলদের’ মাঝখানে রেখে তালিকা তৈরি করে উপজেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়। উপজেলা কার্যালয় থেকে এর কোনো পরিবর্তন করা হয় না। এর ফলে পরীক্ষার সময় ‘সবলদের’ কাছ থেকে সহযোগিতা নিতে ‘দুর্বল’ পরীক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়। ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী অপরের সাহায্য ছাড়াই পরীক্ষা দেয়। অবশ্য এদের কাছ থেকে বাকিদের সাহায্যের দ্বার উন্মুক্ত ছিল। পরিদর্শকেরা পরীক্ষার হলে মুঠোফোন ব্যবহার করেন এবং খুদে বার্তার মাধ্যমে হলের বাইরে থেকে প্রশ্নের উত্তর বহন করে। তারা প্রশ্নের উত্তর বলে দিয়ে বা ব্ল‍্যাকবোর্ডে লিখে দিয়ে পরীক্ষার্থীদের সাহায্য করেন। পরীক্ষার্থীরা যেন একে অন্যের উত্তরপত্র দেখে লিখতে পারে, পরিদর্শকেরা সে সুযোগও করে দেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা দি ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন ফিন্যান্সিং গ্লোবাল এডুকেশন অপরচুনিটি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের ১৭টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতের ওপর গবেষণা করে ‘দ্য লার্নিং জেনারেশন: ইনভেস্টিং ইন এডুকেশন ফর আ চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনের বরাতে দৈনিক বণিক বার্তা-য় ২৮ অক্টোবর ২০১৬ প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে গড়ে ১৬ শতাংশ শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। শিক্ষকদের অনুপস্থিতির কারণে শ্রেণীকক্ষে প্রতি বছর গড়ে ২০ শতাংশ শিক্ষা ঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এতে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বছরে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। আর শিক্ষক অনুপস্থিতির মূল কারণ নজরদারির অভাব এবং অনেক বিদ্যালয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ না থাকা।

এখানেই শেষ নয়। গরীব মানুষের সন্তানদের শিক্ষা থেকে বের করে দেয়ার ব্যবস্থা পুরোপুরি পাকাপোক্ত করার জন্য এবার তারা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) এর নামে এক চরম শিক্ষাধ্বংসী প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছেন। স্কুল শিক্ষার ক্ষেত্রে যখন এইরকম ভয়াবহ অনিয়ম বিশৃংখলা চলছে ঠিক তখন পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় বিদ্যুৎ ও জালানি, যোগাযোগসহ কয়েকটি খাতের ধারাবাহিকতায় এবার শিক্ষা খাতেও তা সরকার বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর ইতিমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার বিভিন্ন দিক নির্ধারণ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। অধিদপ্তরের সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের (সেসিপ) সহায়তায় ‘পিপিপি সেল’ এই কাজ করছে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, পিপিপির আওতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলে প্রয়োজনে বেতন একটু বেশি নির্ধারণ করা হবে। তবে স্কুলের বাইরে প্রাইভেট বা কোচিং করানোর সুযোগ রাখা হবে না। এতে শিক্ষার্থীরা কম খরচে মানসম্মত শিক্ষা পাবে। আর পিপিপির আওতায় পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাফল্য অর্জন করলে অন্যান্য স্কুলও শিক্ষার্থী হারানোর ভয়ে পড়ালেখায় মনোযোগী হবে।

পিপিপি সেলের কর্মকর্তারা জানান, পিপিপির আওতায় স্থাপন হতে যাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার জন্য সরকার ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ২০ থেকে ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তি হবে। আর এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য একটি প্রকল্পও গ্রহণ করা হবে।

এইসব রিপোর্ট এতো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করার দরকার হলো কারণ শিক্ষাখাতে সুষ্ঠু বিনিয়োগের নামে আসলে মুনাফার হার আরো বাড়ানোর জন্যই এই সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাগুলোর এত পাঁয়তারা এবং গবেষণা। তারা চায় দক্ষ বিনিয়োগ এবং অধিক মুনাফা উৎপাদনে দক্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সহায়তাপ্রাপ্ত এই সংস্থাগুলোর এইসব নিয়ে গভীরভাবে গবেষণামূলক কাজ করলেও বাংলাদেশের প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর এই প্রশ্নে উল্ল্যেখযোগ্য ভূমিকা দেখা যায় না। অথচ বাংলাদেশের গরীব মানুষের সন্তানেরা যেটুকু শিক্ষা পায় তা এই প্রাথমিক এবং বড়জোর মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত। সমাজতন্ত্র বা শ্রমজীবী জনগণের পক্ষে কথা বলার, লড়াই করার অঙ্গীকার নিয়ে যে কর্মীরা সংগঠন করছে, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কর্মসূচী প্রণয়নের সময় কেন তাঁদের চিন্তায় এবং কর্মসূচীতে গরীব মানুষের শিক্ষার প্রশ্নটি প্রাধান্যে আসে না-এই ভাবনা জরুরী।

ঠিক এই জরুরী অনুসন্ধানই করতে চেয়েছেন কমরেড বদরুদ্দীন উমর সেই ১৯৯৯ সালে তাঁর ‘শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য’ লেখায়। এবং শুধু অনুসন্ধান করে ক্ষান্ত হননি, তিনি তাঁর ‘শিক্ষা ও শিক্ষা আন্দোলন’ শীর্ষক প্রবন্ধ সংকলনে শিক্ষা সংক্রান্ত কর্মসূচীর শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গী উত্তরণে করণীয় ও কর্মসূচী প্রণয়ন নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন।

কেন এইরকম ঘটনা ঘটছে? কেন শ্রমিক শ্রেণীর সাথে একাত্ম হওয়ার কথা বললেও, কেন শ্রমিক শ্রেণীর মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন সংগ্রামে নেমে আসলেও এবং এর জন্য ত্যাগ, রক্ত দিতে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও বাস্তব কর্মসূচীর ক্ষেত্রে এসে ছাত্র সংগঠনগুলো এমন কর্মসূচী দিচ্ছে যার সাথে শ্রমজীবী জনগণের সন্তানদের শিক্ষা প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণভাবে আসছে না?

এর কারণটি উদ্ধৃত করতে গিয়ে বদরুদ্দীন উমর ‘শিক্ষা ও শিক্ষা আন্দোলন-রাজনৈতিক শিক্ষা’- প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন,

‘শিক্ষা ক্ষেত্রে এই কর্মসূচী প্রণয়ন ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে সমাজের বাস্তব পরিস্থিতি, আর্থসামাজিক সম্পর্ক অর্থাৎ এক কথায় ঐতিহাসিক স্তর সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে শিক্ষা আন্দোলনের নামে যে ধরণের আন্দোলন হয়ে থাকে সেগুলোর মধ্যে এই সাধারণের বিষয়ে ধারণার অসম্পূর্ণতা, অস্পষ্টতা, এমনকি অধিকাংশের ক্ষেত্রে অনুপস্থিতি, যথেষ্ট লক্ষ্যণীয়।’ (শিক্ষা ও শিক্ষা আন্দোলন- রাজনৈতিক শিক্ষা)

কিন্তু আন্দোলনের নেতা কর্মী বা কর্মসূচী যারা প্রণয়ন করছেন তাঁদের মধ্যে এই সংক্রান্ত অস্পষ্টতা থাকলেও বাস্তবতায় এই আন্দোলনগুলো কোন না কোন শ্রেণীর পক্ষেই যায়।

এই সম্পর্কে একই প্রবন্ধে বদরুদ্দীন উমর আর বলছেন,

‘প্রত্যেক শিক্ষা ব্যবস্থাই কোন না কোন রাজনৈতিক আদর্শগত চিন্তা দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকে এবং কোন শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন করে অন্য শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন ও প্রচলনের জন্য যে আন্দোলন হয় সে আন্দোলনও পরিচালিত হয় কোন না কোন রাজনৈতিক আদর্শগত চিন্তার বশবর্তী হয়ে… যারা মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য দাঁড়ায় তারা সামাজিক বিকাশের এমন এক স্তরের প্রতিনিধি হিসেবে সেটা করে যারা সাধারণভাবে সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধের উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে। সে কারণে মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে যে শুধু ধর্মীয় উপাদান থাকে তাই নয়, তার মধ্যে সামন্ততান্ত্রিক সমাজের বিবিধ প্রকার ধর্মবহির্ভূত উপাদানও থাকে। যারা শিক্ষাকে ধর্মের প্রভাবমুক্ত করার জন্য আন্দোলন করে তারা হতে পারে গণতন্ত্রী বা সমাজতন্ত্রী। অর্থাৎ এরা হতে পারে সমাজ বিকাশের দুই স্তরের প্রতিনিধি। যারা উচ্চশিক্ষার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করে তারা হলো বুর্জোয়া সমাজের মধ্য ও ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধি। যারা জনগণের সার্বজনীন শিক্ষার জন্য দাঁড়ায় তারা হতে পারে গণতন্ত্রী অথবা সমাজতন্ত্রী। কারণ জনগণের সার্বজনীন শিক্ষার প্রয়োজন ও দাবী হল শিল্প সমাজের প্রয়োজন ও দাবী। যারা গণতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য দাঁড়ায় তারাও হতে পারে গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রী।’ (শিক্ষা ও শিক্ষা আন্দোলন- রাজনৈতিক শিক্ষা) কমরেড বদরুদ্দীন উমর যে কথাগুলো বলতে চেয়েছেন তা হলো:

১। যেকোন শিক্ষা ব্যবস্থা কোন না কোন রাজনৈতিক মতাদর্শকে প্রতিনিধিত্ব করে।

২। ফলে সেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংস্কার করতে বা সেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে পালটে ফেলতে যে শিক্ষা আন্দোলন সেটিও কোন না কোন মতাদর্শকে প্রতিনিধিত্ব করে।

৩। অর্থাৎ দুটি ক্ষেত্রেই শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা আন্দোলন ও কর্মসূচীর শ্রেণী চরিত্র আছে। এবং এই শ্রেণী চরিত্র সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার।

৪। যেকোন শিক্ষা আন্দোলনের কর্মসূচী প্রণয়ণের ক্ষেত্রে সেই সময়ের ঐতিহাসিক স্তর এবং আর্থসামাজিক সম্পর্ক সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।

এই সচেতন থাকার মানে এই নয় যে সেই ঐতিহাসিক পরিস্থিত আমরা মেনে নিলাম। বরং ঐ ঐতিহাসিক পরিস্থিতির বিকাশের দিকে লক্ষ্য রেখেই আমাকে আমার কর্মসূচী সাজাতে হবে যাতে ভূতের পায়ের মত পশ্চাতমুখী কর্মসূচী আমি না দেই। আমাদের ঠিক করা দরকার, আন্দোলন পেছনমুখী হবে, না সমাজের ঐতিহাসিক বিকাশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে?

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের দিকে তাকালে এটি কখনোই বোধ হবে না যে এখানে শিক্ষা আন্দোলনের কর্মসূচী প্রণয়নে এই ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ও আর্থসামাজিক সম্পর্কের দিকে দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজন কর্মসূচী প্রণেতারা বোধ করেন। বর্তমান পুঁজিবাদী সম্পর্কের মধ্যে বিদ্যমান উৎপাদন সম্পর্ক এবং তার সাথে শিক্ষাব্যবস্থার সম্পর্কের ব্যাপারে তাঁদের বিবেচনা একেবারেই অনৈতিহাসিক।

বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা সংকোচন ও শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে যে আন্দোলনগুলো চলছে তার কেন্দ্রীয় শ্লোগানের দিকে তাকালেই এই বিষয়টিই দেখা যায়। এই শ্লোগানগুলো হল ‘শিক্ষাকে পণ্য করা যাবেনা’, ‘শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ করা যাবেনা’, ‘Education is not for sell, we are not customer’ ইত্যাদি।

এই শ্লোগানগুলো আসলে এমনভাবে তোলার মানে দাঁড়াচ্ছে, ‘পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক থাকবে’ এর মধ্যেই বণ্টনসম্পর্ক এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে শিক্ষার পণ্যচরিত্র লোপ পায়। যাতে আমরা যে ‘কাস্টমার’ এই চরিত্র লোপ পায়। কিন্তু এইভাবে শ্লোগান উপস্থাপন করার মাধ্যমে আসলে শিক্ষার পণ্যচরিত্র, পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক এবং শিক্ষা ব্যবস্থার শ্রেণী চরিত্র আড়ালই করা হচ্ছে। আমাদের দেশে তো বটেই বর্তমানে সারা দুনিয়ার শিক্ষা আন্দোলনেই শিক্ষা প্রশ্নটিকে পুঁজিবাদী সম্পর্কের বাইরে নিয়ে গিয়ে ইউটোপিয়ান রাজ্যের অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে মার্কস বলেছেন, ‘বুর্জোয়া শ্রেণী যেখানেই প্রাধান্য পেয়েছে সেখানেই সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক, পিতৃতান্ত্রিক ও প্রকৃতি শোভন সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে। যা সব বিচিত্র বন্ধনে মানুষ বাঁধা ছিল তার স্বভাবসিদ্ধ উর্ধ্বতনের কাছে তারা ছিঁড়ে ফেলেছে নির্মমভাবে। মানুষের সাথে মানুষের অনাবৃত স্বার্থের বন্ধন নির্বিকার টাকার বাঁধন ছাড়া এরা কিছুই বাকি রাখেনি। আত্মসর্বস্ব হিসাব-নিকাশের বরফজলে এরা ডুবিয়ে দিয়েছে ধর্ম উন্মাদনার স্বর্গীয় ভাবোচ্ছ্বাসকে শৌর্যবৃত্তির উৎসাহ ও কূপমণ্ডুক ভাবালুতা। লোকের ব্যক্তিমূল্যকে এরা পরিণত করেছে বিনিময় মূল্যে, অগণিত অনস্বীকার্য সনদবদ্ধ স্বাধীনতার স্থলে এরা এনে দাঁড় করালো ঐ একটিই নির্বিচার স্বাধীনতা- অবাধ বাণিজ্য।”

শিক্ষাও এর বাইরে পবিত্র কোন ব্যাপার নয় যে এটি সেই পণ্যকরণের বাইরে থাকবে। ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক এই পুঁজির গতিপ্রকৃতির ঐতিহাসিক মানদণ্ডেই নির্ধারিত হবে।

কার্ল মার্কস যেমন বলেছেন,

La schoolmaster is a productive labourer when, in addition to be labouring the heads of his scholars, he works like a horse to enrich the school proprietor. That the latter has laid out his capital in a teaching factory, instead of in a sausage factory, does not alter the relation. Hence the notion of a productive labourer implies not merely a relation between work and useful effect, between labourer and product of labour, but also a specific, social relation of production, a relation that has sprung up historically and stamps the labourer as the direct means of creating surplus-value. (Karl Marx. Capital, Volume One, Part V. The Production of Absolute and of Relative Surplus-Value)

অর্থাৎ কার্ল মার্কস বলতে চেয়েছেন যে, একজন স্কুল শিক্ষক হচ্ছেন একজন উৎপাদনশীল শ্রমিক, শিক্ষার্থীদের জ্ঞানদানের পাশাপাশি আসলে সে কাজ করে স্কুল মালিককে সমৃদ্ধ করার জন্য। সেই মালিক একটি সসেজ ফ্যক্টরীর মতই এখানে পুঁজি বিনিয়োগ করেছে তাতে তাদের সম্পর্কের কোন পরিবর্তন হয় না। ফলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদন করা। এর বাইরে অন্য কোন ‘পবিত্র’ সম্পর্ক এখানে নেই।

এটা পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে, যারা এইভাবে শিক্ষাকে পণ্য করা যাবে না, এবং এই দাবীতে শিক্ষা আন্দোলন করেন তাঁরা আসলে পেটি বুর্জোয়া সমাজতন্ত্রী। তাঁরা উৎপাদন সম্পর্ক আর বণ্টন দুটিকে সম্পর্কহীন আলাদা আলাদা বর্গ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এবং এরা সমাজতন্ত্রকে শুধু ‘বণ্টনের ব্যাপার’ বলে উপস্থাপন করেন।

এদের চরিত্র সম্পর্কে কার্ল মার্কস গোথা কর্মসূচীর সমালোচনায় লিখেছেন,

‘ভোগ্যপণ্যের উপকরণসমূহের যে বণ্টনই হোক না কেন তা আসলে উৎপাদনের শর্তসমূহের বণ্টনেরই ফলাফল মাত্র। শেষের এই বণ্টনটি আবার খোদ উৎপাদন সম্পর্কের বৈশিষ্ট্যসূচক। উদাহরণস্বরূপ, পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের ভিত্তিটি হল এই যে, উৎপাদনের বস্তুগত শর্তাবলী পুঁজি ও ভূমি সম্পত্তির আকারে অশ্রমিকদের হাতে রয়েছে, আর জনগণের মালিকানায় কেবল উৎপাদনের ব্যক্তিগত শর্তটি, শ্রমশক্তি। উৎপাদনের উপকরণসমূহের যদি এই হয় বণ্টন, তাহলে ভোগের উপকরণ সমূহের বণ্টনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্তমান চেহারা নেবে। বন্টনকে উৎপাদন সম্পর্ক থেকে স্বাধীনভাবে বিবেচনা করা এবং সমাজতন্ত্রকে কেবল মূলত বণ্টনের ব্যাপার বলে উপস্থাপিত করবার ধরণটি বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে স্কুল। সমাজতন্ত্রীরা (এবং তাদের কাছ থেকে ধার করেছেন গণতন্ত্রীদের একাংশ)। (১৮৭৫ সালে সোস্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি অফ জার্মানী নামে একটি একক পার্টি গঠিত হয় দুটি সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে। এই কংগ্রেসে পার্টি যে কর্মসূচী গ্রহণ করে তার সমালোচনা করে মার্কস একটি লেখা লেখেন যা গোথা কর্মসূচী নামে পরিচিত।

এখন প্রশ্ন হল এইভাবে উপস্থাপন করার সমস্যা কী? এইভাবে চিহ্নিত করলে যে সমস্যাটি দাঁড়ায় তা হলো:

১। শিক্ষাকে শ্রেণীপ্রশ্নের বাইরে একটি শ্বাশত ও নৈতিক বিষয় হিসেবে স্থাপন করা হয়। ফলে বদরুদ্দীন উমর যেভাবে বলেছেন ‘প্রতিটি শিক্ষা ব্যবস্থাই কোন না কোন রাজনৈতিক আদর্শগত চিন্তা দ্বারা নির্ধারিত হয় থাকে’- শিক্ষাকে উৎপাদন সম্পর্ক তথা শ্রেণীপ্রশ্নের বাইরে স্থাপন করার মধ্যে দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শ্রেণী চরিত্রকে আড়াল করা হয়।

২। শিক্ষা দেয়ার প্রশ্নটি রাষ্ট্রের শাসকদের নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে চিহ্নিত হয়। অর্থাৎ এই প্রতিপাদ্য উত্থাপন করা হয় যে, আজ নৈতিকতার অধঃপতন হয়েছে বলেই পুঁজিবাদী শাসকরা আজকে শিক্ষাটা দিচ্ছেনা (1) এরা শিক্ষা পণ্য করা যাবেনা এই শ্লোগান উত্থাপন করে রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্রের উদ্বোধন কামনা করে। রাষ্ট্রকে আরো নৈতিক বা আরো গণতান্ত্রিক আচরণ করার দাবী করার মানে হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধবিশ্বাসসূলভ দাসত্ব। রাষ্ট্রের ভেতরেই গণতন্ত্রের জমি বাড়ানোর উত্তরাধুনিক ঢঙের আবেদন নিবেদনের আন্দোলন।

এই পেটিবুর্জোয়ারা বলেন, তাঁরা নাকি আসলে এই কথা বলার মধ্য দিয়ে জনগণের কাছে পুঁজিবাদীদের ‘চরিত্র’ (1) ‘উন্মোচন’ করে। জনগণকে এরা দেখায় পুঁজিবাদীরা কত খারাপ (1)। আমাদের সাথে আন্দোলনে আসো। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে এই পেটি বুর্জোয়ারাই জনগণের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী কোন কর্মসূচী দেন না। বরং তাঁদের কর্মসূচি প্রণয়ণের ক্ষেত্রে এই পেটি বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গীই কাজ করে এবং এই পেটি বুর্জোয়াদের স্বার্থেই শিক্ষা কর্মসূচী এবং শিক্ষা আন্দোলনগুলো পরিচালিত হয়।

তাহলে আমরা কি পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে শিক্ষা আন্দোলন করব না? অবশ্যই করব। কিন্তু কোন কৌশলে এবং কোন কর্মসূচীর ভিত্তিতে আমরা আন্দোলন করব যা শ্রমিক শ্রেণীর মতাদর্শের পক্ষে যাবে, সেটি আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। এই কর্মসূচী প্রণয়ণের ক্ষেত্রে ইউটোপিয়ায় আক্রান্ত হওয়া যাবে না। এই কথাটিই বদরুদ্দীন উমর শিক্ষা সংক্রান্ত প্রবন্ধগুলোতে বলতে চেয়েছেন।

এই কাজটি করা যাবে যদি আমরা শিক্ষা প্রশ্নে দুটি প্রশ্ন ফয়সালা করতে পারি।

১। রাষ্ট্র কেন আগে শিক্ষা দিত?

২। রটে কেন এখন শিক্ষাটা দিচ্ছেনা কিংবা শিক্ষা সংকোচন করছে।

বাসদ নেতা খালেকুজ্জামানের ‘শিক্ষা দর্শন’ শীর্ষক প্রবন্ধে (সংস্কৃতি, জুলাই ২০০০ সংখ্যায় প্রকাশিত) হাসিবুর রহমান ব্যাখ্যা করেছেন, কেন, কী উদ্দেশ্যে এবং তী উপায়ে রাষ্ট্র সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা দেয়। তিনি ওই প্রবন্ধে বলেন, ‘পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কর্তৃক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করার, বা উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন পর্যন্ত শিক্ষার ব্যয়ভার বহনের আরেকটি দিক আছে। একচেটিয়া পুঁজির যুগে শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে শ্রমিক আন্দোলন শক্তিশালী হওয়ার সাথে সাথে কেবল ব্যক্তিগত মজুরী দিয়েই শ্রমিককে তার শ্রমশক্তির দাম চুকিয়ে দেয়া হয় না। এর পাশাপাশি আবির্ভাব ঘটেছে সামাজিক মজুরীর (Social wage)। ব্যক্তি হিসেবে সমাজে কে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কতটুকু অবদান রাখলো তার আলাদা হিসাব-নিকাশ ছাড়াই সমাজ বা রাষ্ট্র একজনকে যে সুবিধাটুকু প্রদান করে তাই হলো সামাজিক মজুরী। লেনদেনটা এখানে নগদ অর্থে হয় না। যেমন বিনামূল্যে প্রাথমিক (বা মাধ্যমিক) শিক্ষা, শিশুদের জন্য টিকা, পাঠাগার ইত্যাদি।’

অর্থাৎ রাষ্ট্র মোটেই নৈতিক দায় থেকে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা দেয় না। রাষ্ট্র সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করে উৎপাদন প্রক্রিয়া টিকিয়ে রাখার জন্য। এর আগেই আলোচনা করা হয়েছে পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থা হল উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদনের একটি জায়গা এবং শিক্ষককে সেখানে সসেজ ফ্যাক্টরীর শ্রমিকের মতই উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদন করে এবং রাষ্ট্র এই বাবদ সামাজিক মজুরী প্রদান করে।

এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে বর্তমান কোন বৈশ্বিক পরিস্থিতি তৈরী হলো যার কারণে রাষ্ট্র এই সামাজিক মজুরী সংকুচিত করছে এবং তারই পথ ধরে শিক্ষা সংকোচনা করছে?

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে মার্কস-এঙ্গেলস ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে জাতিরাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে পুঁজি কিভাবে আন্তর্জাতিক রূপ ধারণ করবে। কেননা, পুঁজির নিজের চরিত্রের মধ্যেই নিহিত আছে খণ্ড খণ্ড পুঁজির মিলিত হওয়া এবং কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা।

‘The bourgeoisie has through its exploitation of the world market given a cosmopolitan character to production and consumption in every country. All old-established national industries have been destroyed or are daily being destroyed. They are destroyed by new industries whose introduction becomes a life and death question. for all civilized countries, by industries that work up raw materials drawn from the remotest zones, industries whose products are consumed in every quarter of the globe The bourgeoisie, by the rapid improvement of all instruments of production, by the immensely facilitated means of communication, draws all, even the most barbarous, nations into civilization (কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে)

আমাদেরকে লেনিন দেখিয়েছেন কিভাবে ভিন্ন ভিন্ন জাতিরাষ্ট্রের ভেতরে পুঁজির এই মিলিত ও কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া নিঃশেষ হয়ে গেছে। মার্কসের সবচাইতে মেধাবী ছাত্র হিসেবে লেনিন আমাদের দেখিয়েছেন কিভাবে পুঁজি জাতিরাষ্ট্রের বাঁধন ছিড়ে এখন আন্তর্জাতিক স্তরে কেন্দ্রীভূত হওয়া শুরু করেছে। কিভাবে সাম্রাজ্যবাদ শব্দটির জন্ম হল। পুঁজিকে টিকে থাকতে হলে এটি করতেই হত। এ তার বাঁচা-মরা প্রশ্ন। পুঁজিবাদ যখন থেকে একচেটিয়া পুঁজিবাদ বা সাম্রাজ্যবাদ হয়ে উঠল তখন থেকেই সে এক অনিবার্য সংকটের জালে জড়িয়ে পড়ল।

পুঁজিবাদের এক সংকট হল মুনাফার নিম্নমুখী প্রবণতা। ১৮৮১ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত পুঁজি মুনাফার হারের এই নিম্নমুখী প্রবণতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। পুঁজি রপ্তানী এবং বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে দিয়েও পুঁজির মুনাফার হারের এই নিম্নগামীতা রোখা যায়নি। আর তাই বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত বিশ্বপুঁজির অবস্থা হল এই যে, জাতিরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রথমে পুঁজির ঘণীভবন এবং পরে পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং পরিশেষে পুঁজি অন্যদেশে রপ্তানী করেও মুনাফার হারের উর্ধ্বগতি বজায় রাখা এর পক্ষে সম্ভব হয়নি।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ শুরুই হলো পুঁজিবাদের সংকট দিয়ে। পুঁজিবাদ তার পূর্ব অভিজ্ঞতায় দেখেছে যে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য খণ্ড পুঁজির মিলন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জাতিরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই প্রক্রিয়া প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে।

টিকে থাকার তাগিদে পুঁজি তখন ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রে থেকে বেরিয়ে এসে আন্তর্জাতিক স্তরে কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করল। যাত্রা শুরু করল বহুজাতিক সংস্থাগুলো। এতে সাময়িকভাবে পুঁজি সঞ্চয়নের সমস্যা থেকে মুক্ত হল। উৎপাদনের মাত্রা অনেক উপরে উঠে গেল এবং বিশ্ব বাণিজ্য পরিসরে চলাচলের মাত্রা বৃদ্ধি পেল, বিশ্বজুড়ে পণ্যের বাজার বিস্তৃত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরী হলো। পুঁজির রপ্তানীর চরিত্রেও এল নির্ধারক পরিবর্তন। শুরু হলো বিভিন্ন জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য।

১৯৮০ দশকে শিল্প-বাণিজ্য-পুঁজির সঞ্চায়ন নিম্নমুখী হলো। প্রয়োজন হয়ে পড়ল আরো বৃহৎ মাত্রায় উৎপাদন ও পুঁজির কেন্দ্রীভবন। সেখানে বাধা হিসেবে থেকে গেছে বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তখনো পর্যন্ত টিকে থাকা বেশ কিছু নিয়মকানুন এবং জাতিরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ।

আন্তর্জাতিক একচেটিয়া পুঁজিকে যদি টিকে থাকতে হয় তাহলে তাকে এই বাধা অপসারিত করতেই হবে।

একদিকে আন্তর্জাতিক পুঁজি আরো সংগঠিত সুসংহত, শৃংখলাবদ্ধ কেন্দ্রীভূত, অন্যদিকে তাদেরই চাপিয়ে দেয়া আনুষ্ঠানিকতা ও আইনী পদ্ধতি মারফত চালু হল অনুন্নত দেশগুলোতে লণ্ঠন। জাতিরাষ্ট্র এবং এর ভেতরকার বুর্জোয়ারা সামগ্রিকভাবে এই লুণ্ঠনের সহযোগী হয়েছে। হয়েছে ছোট শরীক, Organically related। সামাজ্যবাদী পুঁজি এবং স্থানীয় পুঁজি মিলে শুরু হল অবাধ লুন্ঠন। Structural adjustment বা কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস নামে শুরু হল পুঁজির লাগামছাড়া বেসরকারীকরণ ও উদারীকরণ।

এই মুহূর্তে সারা দুনিয়ায় এই বিশ্ব পুঁজির অবারিত লুণ্ঠনের মধ্যেই দুটি দিক স্পষ্টত দৃশ্যমান হচ্ছে। একটি হল, নর্থ ডাকোটা থেকে বাঁশখালী পর্যন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ভূমিপুত্রদের জমির উপর আন্তর্জাতিক পুঁজির শকুনী দৃষ্টি। অন্যদিকে পুঁজিবাদী মুনাফার হার বজায় রাখার জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ সমস্ত সেবাখাতে তথা সামাজিক মজুরীর উপর পুঁজির ভয়াবহ আগ্রাসন। প্রকৃত মজুরী সংকোচন এবং তাঁর মধ্য দিয়ে সে উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাতের আগ্রাসনে মেতেছে বিশ্বপুঁজি। যার প্রতিক্রিয়ায় আমরা দেখেছি ওয়াল স্ট্রিটের উত্থান। আমরা দেখেছি ল্যাটিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ জুড়ে ব্যাপকভাবে ছাত্রদের আন্দোলন, শিক্ষার-সংকোচন বিরোধী আন্দোলনের উত্থান।

এই হল রাষ্ট্র কর্তৃক সামাজিক মজুরী সংকোচনের প্রেক্ষাপট। এই অবস্থায় রাষ্ট্রে সামাজিক মজুরী হিসেবে যা দিত সেইটি রাষ্ট্রের হাত থেকে নৈতিক দাবী দাওয়া উত্থাপন করে সেই দাবী আদায় করার দুরাশাটি পোস্ট মর্ডানিস্টরা করতে পারে। কিন্তু সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য যারা সংগ্রাম করছেন তাঁদের পক্ষে সেটি করাটা একেবারেই অবৈজ্ঞানিক ও অনৈতিহাসিক।

এই পরিস্থিতিতে কর্তব্য কি?

এই যে দানবীয় পুঁজির আগ্রাসন থেকে একদিকে আমাদের পরিবেশ অন্যদিকে স্বাস্থ্য শিক্ষাসহ অন্য অধিকারগুলোকে রক্ষা করতে পারার মত শ্রেণী হল একমাত্র শ্রমিক শ্রেণী। যে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি আজকে শিক্ষাসহ সমস্ত সেবাখাত থেকে উদ্বৃত্ত আত্মসাতের কাজে নেমেছে, সেই পুঁজির শাসন উচ্ছেদ করা ছাড়া আর কোন সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব। এই উচ্ছেদের কাজ আজ কে করবে শ্রমিক শ্রেণী ছাড়া?

ফলে আজকের দিনে শিক্ষার অধিকারের সাথে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতি বিকাশের প্রশ্নটি একেবারে অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পর্কিত।

কিন্তু কিভাবে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রশ্নটি শিক্ষা আন্দোলনের পাশাপাশি কর্মসূচী প্রণয়ণের ক্ষেত্রে হাজির করতে হবে সেই সম্পর্কে বদরুদ্দীন উমর ‘ছাত্র সমস্যা ও ছাত্র আন্দোলন’ প্রবন্ধে বলছেন,

‘বিশেষ পরিস্থিতিতে ছাত্র আন্দোলনের এই গুরুত্ব এমনকি নেতৃত্বমূলক ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও যে ছাত্র আন্দোলন সত্য অর্থে শ্রমিক কৃষক বিপ্লবী সংগ্রামের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে যেতে চায়, এবং সেটাকেই ঐতিহাসিক কর্তব্য বলে মনে করে, তাঁদের দরকার ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্ব শ্রমিক কৃষকের শ্রেণী সংগ্রামের তুলনায় কমিয়ে আনা, বিশেষ করে আন্দোলনের নেতৃত্বমূলক ভূমিকা থেকে কিভাবে সরে এসে শ্রমিক কৃষকের যৌথ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় তার চেষ্টা করা’। (ছাত্র সমস্যা ও ছাত্র আন্দোলন)

কমরেড বদরুদ্দীন উমরে এই কথাগুলো তাঁর কাজের সামগ্রিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা না করলে অনেকের কাছে মনে হতে পারে যে, তিনি ছাত্র আন্দোলন বা শিক্ষা সম্পর্কিত আন্দোলন বন্ধ করে বা একেবারে কমিয়ে এনে শ্রমিক কৃষকের দাবী নিয়েই শুধু ছাত্রসমাজ অগ্রসর হবেন এই কামনা করছেন।

কিন্তু বিষয়টি মোটেই তা নয়। পরের প্যারাতেই তিনি তা স্পষ্ট করেছেন তা।

তিনি বলছেন,

‘অর্থাৎ কথাটি আপাত দৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হলেও এই বিশেষ অর্থে বিপ্লব ছাত্র আন্দোলনের লক্ষ্য হওয়া উচিত সামগ্রিকভাবে মধ্যশ্রেণীর সচেতন অংশ হিসেবে, বিপ্লবী সংগ্রাম একটি শক্তিশালী সহায়ক শক্তি হিসেবে নিজেদের অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, বা ক্ষেত্র বিশেষে নেতৃত্বমূলক ভূমিকাকে খর্ব করে শ্রমিক কৃষক প্রাধান্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের নীতি, কৌশল ও শ্রমকে বজায় রাখা। এবং এই কাজ করতে গিয়ে আন্দোলনের গতিপথে, বিশেষ অবস্থায়, অন্যদের তুলনায় ছাত্র আন্দোলনকে যদি তীব্র ও ব্যাপক করার প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে সেটি করা।’ (ছাত্র সমস্যা ও ছাত্র আন্দোলন)

কমরেড বদরুদ্দীন উমর পরিষ্কারভাবেই বলতে চেয়েছেন যে, শুধুমাত্র ‘শ্রমজীবী মানুষের সাথে একাত্ম হওয়া’র ঘোষণা দেয়াই যথেষ্ট নয়। শিক্ষা ও ছাত্র আন্দোলন তখনই শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতি বিকাশে সহায়তা করতে পারে যখন তা দুটি কাজ বাস্তবায়নের চেষ্টা করে:

১। শ্রমজীবী জনগণের সন্তানদের শিক্ষার প্রশ্নটিকে কর্মসূচী প্রণয়নের মুখ্য মনোযোগে রাখে। এই প্রশ্নেই ‘ছাত্র আন্দোলনকে তীব্র ও ব্যাপক করার প্রয়োজন’ রয়েছে।

২। শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রশ্নটির সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাজনৈতিক প্রশ্নে বক্তব্য ও কর্মসূচী নির্ধারণ ও পরিচালনা করে।

শ্রমজীবী জনগণের সন্তানদের শিক্ষার প্রশ্নটিকে ছাত্র সংগঠনগুলো কেন্দ্রীয় মনোযোগে রাখেনি। বরং উচ্চশিক্ষার আন্দোলনেই তাদের মূল মনোযোগ।

অন্যদিকে এই প্রবণতার সাথে সম্পর্কিত থেকেই শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতিকে বিকাশের চাইতে বুর্জোয়া সংস্কার আন্দোলনের ঘেরাটোপের মধ্যেই আটকে আছেন তাঁরা। ফলতঃ রাজনৈতিকভাবে বুর্জোয়াদেরই পুষ্ট করছেন।

সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি এবং স্থানীয় পুঁজি মিলেই আজকে সারা দুনিয়ার জনগণের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। আর তাই বুর্জোয়াদের জাতীয় পতাকা, তাদের জাতীয়তাবাদী শ্লোগান, শ্রমিকশ্রেণীর মতাদর্শের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ছাত্র সংগঠন ধারন করতে পারেনা। জাতীয় পতাকা এবং জাতীয়তাবাদ নয়, ঐতিহাসিকভাবে শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদের পতাকা উর্ধ্বে তুলে ধরেই আজকের দিনে যেকোন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের বিকাশ হতে পারে। নয়ত তা মুখ থুবড়ে পড়বে। বাংলাদেশের শিক্ষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটি আরো জরুরীভাবে সত্য।

কিভাবে শিক্ষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ছাত্ররা এই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই করবে? এই সম্পর্কে বদরুদ্দীন উমর ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শিক্ষা ও শিক্ষা আন্দোলন: উচ্চ শিক্ষা’ প্রবন্ধে বলেছেন,

‘যেকোন দেশের জাতীয় সংস্কৃতির মূল চরিত্র নির্ধারিত হয় সেই দেশের শাসক শ্রেণীর সংস্কৃতির দ্বারা। বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতি বলতে যা বোঝায় তার মধ্যে কিছু গণতান্ত্রিক উপাদান থাকলেও এ সংস্কৃতি হল মূলত শাসক শ্রেণীর সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি যে শ্রেণী গঠন করেছে তারা নিজেরা গঠিত হয়েছে ১৯৭১-৭২ সাল থেকে লুন্ঠন দুর্নীতি সন্ত্রাস ও সাম্রাজ্যবাদের কাছে দেশীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে। সেই থেকে কখনো প্রকাশ্যে কখনো কখনো কৌশলের সঙ্গে ধর্মকে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে। কাজের মধ্যে তেমন কোন প্রগতিশীল উপাদান নেই তা বলাই বাহুল্য। এটা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যক্রমের ওপর প্রায় নিরংকুশ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ের পাঠ্যক্রমের ওপরো যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। এদিক থেকে এই ‘জাতীয় সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির মধ্যে এক বড় রকম ঐক্য বিশ্ববিদ্যলায়ের পাঠ্যক্রম, পাঠদান পদ্ধতি বিভিন্ন প্রকার সেমিনারের আলোচনা ইত্যাদির ক্ষেত্রে দেখা যায়। অর্থনীতি, রাজনীতি, সাহিত্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইতিহাস বিশেষত বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব নৃতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা মূলত এই কাঠামোর মধ্যেই নিহিত রাখে।’ (বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শিক্ষা ও শিক্ষা আন্দোলন: উচ্চ শিক্ষা)’

তিনি আরো বলছেন, ‘সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল জাতীয় সংস্কৃতির কাঠামো যতদিন এই শিক্ষা ব্যবস্থায় টিকে থাকবে ততদিন পর্যন্ত পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই, কাজেই এই কাঠামো চূর্ণ করার আন্দোলনই হবে এদেশে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম মূল লক্ষ।’ (বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শিক্ষা ও শিক্ষা আন্দোলন: উচ্চ শিক্ষা)

বাংলাদেশের প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের তাই শিক্ষা আন্দোলনের শ্রেণী প্রশ্ন নিয়ে অতি জরুরীভাবে আলোচনা, মতবিনিময় এবং তাঁর উপর ভিত্তি করে সঠিক কর্মসূচী প্রণয়নের কাজে এগিয়ে আসা দরকার। চিন্তাগতভাবে শ্রেণীকাঠামো উত্তীর্ণ না হতে পারলে সমাজ পরিবর্তনের লড়াইয়ে তাঁদের পরিশ্রম ও মনোযোগ ফলপ্রসূ জায়গায় পৌছুতে ব্যর্থ হবে। বদরুদ্দীন উমর শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য প্রবন্ধে বলেছেন,

‘চিন্তাগতভাবে এই শ্রেণীকাঠামো ভেঙ্গে না ফেলে… বৈষম্য বিবেচনা করলে সমাজে শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রকৃত বৈষম্য দূরীকরণের এমন কোন আন্দোলনই গড়ে তোলা সম্ভব নয় যাকে সত্য অর্থে বিপ্লবী তো নয়ই এমনকি গণতান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়।’ (শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য)

সামিউল আলম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Must Read

Bangladesh writers association

সাম্প্রতিক নারী ও শিশু নিপীড়ন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

(১২/০৩/২০২৫) বাঙলাদেশ লেখক শিবির কেন্দ্রীয় পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মুঈনুদ্দীন আহ্‌মদ এবং সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল এক বিবৃতিতে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারীদের ওপর চলমান...