ঔপনিবেশিকতা একটি নির্মম রাজনৈতিক বাস্তবতা। সম্পদ আহরণের তাগিদে মানুষের গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ বিগ্রহের মাধ্যমে ভূখণ্ড দখল এবং শত্রুপক্ষের বন্দিদের দাস বানিয়ে তাদের শ্রম লুট করে সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া বলতে গেলে আদিমকালেই শুরু হয়। কিন্তু ষোড়শ শতকের ইউরোপ, মধ্য- ও উত্তর আমেরিকার সামন্ত উৎপাদন ব্যবস্থায় যখন দাস-শ্রমের প্রয়োজন হয়, তখন তারা আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে দাস-ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের দেশে দাসত্বপ্রথা চালু করে। তারা এশিয়া থেকে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক এবং আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাস সংগ্রহে নিয়োজিত হয়। আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলের দেশগুলি থেকে তারা সংগ্রহ করে কালো মানুষ এবং তাদের উত্তর আমেরিকার ভূখণ্ডে এবং মধ্য আমেরিকার দ্বীপদেশগুলোয় এনে বিক্রি করে দাস হিসেবে; এবং ইক্ষু, তুলা ইত্যাদি উৎপাদনের জন্য বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে তাদের নিয়োজিত করে। পরবর্তীকালে পরিবর্তিত উৎপাদন ব্যবস্থায় এরাই ঔপনিবেশিকতার একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় অস্টাদশ শতকে ভারতে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে আফ্রিকায়।
আফ্রিকার ভূখণ্ডে ইউরোপীয়রা যাবার আগে থেকেই সেখানে দাসপ্রথা চালু ছিল। গোত্রীয় যুদ্ধ বিগ্রহে পরাজিত গোত্র থেকে আটক বন্দিদের দাস হিসেবে নিয়োজিত করা হতো। তবে এই দাসদের প্রতি কালো দাস-মালিক, গোত্রপতির আচরণ ছিল অন্যরকম, অনেক স্বাভাবিক। সেখানে বর্ণবাদের কোনো স্থান ছিল না। অনেক ক্ষেত্রেই দাসকে মনিব ছেলের মর্যাদায় ঘরের বা মাঠের কাজে নিয়োজিত করতো এবং মনিবের পরিবারে সে বিয়েও করতে পারতো এবং ক্রমেই সে পরিবারের মালিক এবং মনিবের মৃত্যু হলে তার উত্তরাধিকারীও হতে পারতো। তবে আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ দাসত্ব প্রথায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে যখন ইউরোপীয় দাস ব্যবসায়ীরা এখান থেকে দাস সংগ্রহ শুরু করে। আফ্রিকান গোত্রপতিরা বন্দুক, ঘোড়া, মাদক ও উপহার হিসেবে টোটকা জিনিসপত্রের বিনিময়ে শ্বেতাঙ্গ দাস ব্যবসায়ীদের কাছে নিজেদের মানুষকেই বিক্রি করে দিতো। বন্দুকের লোভে, ঘোড়ার লোভে গোত্রপতিরা রীতিমতো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে ইউরোপীয়দের সঙ্গে দাস ব্যবসা করতো। সংগ্রহে বন্দুক থাকলে, ঘোড়া থাকলে প্রতিবেশী শত্রু গোত্রপতিকে পরাজিত করা সহজ হতো। অস্ত্রপাতির সংগ্রহ যত বাড়তো, তত তার শক্তিও বাড়তো। এভাবে দেখা গেল কোনো গোত্রপতি শ্বেতাঙ্গের সঙ্গে দাস ব্যবসায়ে রাজি না হলে কিংবা শ্বেতাঙ্গের দেয়া উপহার নিতে অস্বীকৃতি জানালে তার প্রতিবেশী গোত্রপতি এ ধরণের সুযোগ লুফে নিত এবং পড়শিকে যুদ্ধে পরাজিত করে স্বয়ং গোত্রপতিকেই শ্বেতাঙ্গ দাস সংগ্রাহকের হাতে তুলে দিতে পারতো। এভাবে পশ্চিম আফ্রিকার কিছু দেশ ইউরোপীয় জাতিগুলোর সঙ্গে মারাত্মক এক আত্মঘাতী দাস ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়েছিল।
ওদিকে ঊনবিংশ শতকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব শুরু হলে বাণিজ্য-পুঁজিতে ভাটা পড়ে এবং শিল্প-পুঁজি বৃদ্ধি পেলে দাস ব্যবসাও অলাভজনক এবং অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। ইউরোপীয় দাস ব্যবসায়ীদের পক্ষে এ ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থায় মন্দা অবস্থা সৃষ্টি হলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়া হয় সহজ, কারণ তারা তো ওই পরিবর্তনেরই অংশ। কিন্তু আফ্রিকার রাজা কিংবা গোত্র প্রধানরা পড়ে মুশকিলে। দাস ব্যবসা থেকে অর্জিত ওদের পুঁজি অপ্রতুল, এবং তা অনুৎপাদনশীল কাজে ব্যয় করায় এবং তাদের তরুণ ও যুবক মানব সম্পদ দাস হিসেবে বিক্রি হওয়ায় তারা এমন কোনো দেশীয় পুঁজিও সৃষ্টি করতে পারল না যে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াবে। এজন্য উনবিংশ শতাব্দীতে যখন ইউরোপীয়রা তাদের ভূখণ্ড দখল করে উপনিবেশের পত্তন করতে চাইল তখন তারা একেবারেই অপ্রস্তুত। তারা পুরোপুরি অবক্ষয়প্রাপ্ত এবং বিপর্যস্ত। আর ঠিক এরকম সময়েই ইউরোপীয়রা অন্ধকারাচ্ছন্ন আফ্রিকা, বর্বরদের আফ্রিকা ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে আফ্রিকার দেশ দখলের এবং তাদের সভ্য করার নৈতিক অধিকারের দোহাই দিয়ে নিজেদের অপকর্মের স্বপক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়। ইউরোপের উপনিবেশে পরিণত হবার ফলে আফ্রিকার নিজস্ব পুঁজি এবং উৎপাদন ব্যবস্থা সৃষ্টির যেটুকু সম্ভাবনা ছিল তাও গেল নষ্ট হয়ে।
অন্যদিকে ক্যারিবিয়ান দ্বীপাঞ্চলে এবং যুক্তরাষ্ট্রে নয়া বিশ্ব আবিষ্কারের শুরু থেকেই (পঞ্চদশ শতকের শেষে) তারা তাদের দখল কায়েম করে এবং সেখানকার কারিব, আরাওয়াক, মারুন, ইত্যাদি আদিবাসীদের দমন করে, ধ্বংস করে কিংবা বিভক্ত করে। এজন্য এবং নানা অসুখ-বিসুখ মহামারীর জন্য আদিবাসীদের সংখ্যা ঐ সব দ্বীপে কমে যায় এবং ইউরোপীয় ভূস্বামীদের জন্য প্রয়োজন হয় বড়ো বড়ো শূগার প্ল্যান্টেশনে চাষি শ্রমিকের। সেখানে ইউরোপ এবং এশিয়া থেকে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক এনে তাদের দিয়ে এইসব বড় বড় ফার্মে কাজ করানো হয়। আপাতদৃষ্টিতে এরা স্বেচ্ছায় এলেও এবং বছর কি পাঁচ বছর ওয়ারি চুক্তিভিত্তিক কাজ করলেও এদের মর্যাদা ছিল অস্থায়ী দাসেরই।
বলাই বাহুল্য, দাসত্ব প্রথার মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক। বর্ণবাদ অর্থাৎ অশ্বেতাঙ্গরা জন্মগতভাবেই নিকৃষ্টতর মানুষ এজন্য তাদের দখল করে ব্যবসা করা, দাসত্বে নিয়োজিত করা তেমন অন্যায় কিছু নয়—এমন ধারণা আসে এই অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের বৈধতা অর্জনের জন্য। বিশেষ করে আফ্রিকা থেকে আনা দাসদের প্রতি যে আচরণ করা হতো তা ইউরোপীয় প্রভুদের জন্য ছিল একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। ক্যারিবিয়ানে শ্বেতাঙ্গ বা এশীয় দাসদের পাঁচ বছর পর্যন্ত ভূমিদাস হিসেবে খাটানো যেত এবং দাসত্বে জন্ম নেয়া দাসেদের সন্তানেরা মুক্ত মানুষ হিসেবেও গণ্য হতো, কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষেত্রে এই দাসত্ব ছিল স্থায়ী এবং তাদের সন্তান সন্ততিও পেতো ক্রীতদাসেরই মর্যাদা। শ্বেতাঙ্গ বা বাদামী দাসেরা ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হলেও কৃষ্ণাঙ্গদের পরিচয় ছিল বর্ণভিত্তিক সম্প্রদায় হিসেবে। এভাবেই কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের শোষণ করে যেমন অর্থনৈতিকভাবে শ্বেতাঙ্গ ভূস্বামীরা লাভবান হতো তেমনি তাদের নিকৃষ্টতম মানুষ কিংবা অর্ধমানব হিসেবে গণ্য করে মনস্তাত্ত্বিকভাবে এক ধরনের স্বস্তিও বোধ করতো। আবার, এই নিকৃষ্ট মানুষগুলোকে সভ্য করা তাদের কর্তব্য এবং সেজন্য স্বয়ং ঈশ্বরই তাদের প্রেরণ করেছেন—এমন চিন্তা থেকে তারা ধর্মীয় প্রেরণা ও উদ্দীপনাও লাভ করতো।
এভাবে ক্রমে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে বড় বড় কৃষি খামারে কাজ করতে আসা কৃষ্ণাঙ্গদের সংখ্যা শ্বেতাঙ্গ সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়। ইউরোপীয়রা এসব দ্বীপে স্থায়ীভাবে বাস করতে তেমন আগ্রহী ছিল না। আফ্রিকান নৃপতিদের সঙ্গে দাস বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা ক্যারিবিয়ানে প্রচুর আফ্রিকান ক্রীতদাস নিয়ে আসে। এবং এই সরবরাহ অব্যাহত থাকে কারণ আফ্রিকান ক্রীতদাসদের মূল্য চুক্তিভিত্তিক দাসদের চেয়ে ছিলো কম এবং তারা এশিয়া এবং পূর্ব ভারতীয় অঞ্চল থেকে আসা শ্রমিকদের চেয়ে কৃষি শ্রমিক হিসেবে দৈহিকভাবে যোগ্যতর প্রমাণিত হয়েছিল। সংখ্যাধিক্য হওয়ায় এই আফ্রিকান দাসরা নিজেদের ভেতর এক ধরনের ভ্রাতৃ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পেরেছিল। ফলে তাদের ভেতর ইউরোপীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ করা যেমন তারা প্রতিরোধ করতে পেরেছিল, তেমনি স্থানীয় অভিজ্ঞতা লব্ধ একটা নিজস্ব সংস্কৃতিও গড়ে তুলেছিল।
ক্যারিবিয়ান এবং আফ্রিকান উপনিবেশিকতা থেকে ভিন্ন এক ধরনের সরাসরি বর্ণবাদভিত্তিক উপনিবেশিকতা গড়ে উঠেছিল উত্তর আমেরিকায় বলতে গেলে ১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র দেশটি সৃষ্টি হওয়ার আগে থেকেই। পঞ্চদশ শতকের শেষ থেকেই আমেরিকা বা যাকে বলা হতো নিউ ওয়ার্ল্ড, তো তখন থেকেই ইউরোপ থেকে জাহাজ ভরে লোকজন এসে আমেরিকার ভূখণ্ডে নামতে থাকে এবং সেখানেই তারা স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেয়। নিজেদের দেশে এদের অনেকে নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকায় বিচার এড়াতে, অনেকে আবার ক্যাথলিক ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার হওয়ায় পালিয়ে আসে। এদেশে দীর্ঘকাল থেকে বসবাসরত স্থানীয় আমেরিন্ডিয়ান অধিবাসীদের জায়গা জমি দখল করে, তাদের হত্যা করে ওরা ভূমির দখল নেয় এবং চাষবাস শুরু করে। আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের এরা দাস বানাতে পারেনি কিন্তু তাদের অনেকটাই নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছিল। এ সময়েই আফ্রিকার সঙ্গে দাস ব্যবসা জমে ওঠে এবং কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের জাহাজ বোঝাই করে এ দেশে এনে তারা জমিতে তুলা এবং অন্যান্য অর্থকরী শস্য চাষে তাদের নিয়োজিত করে। এভাবে যুক্তরাষ্ট্রে যে দাসত্ব প্রথা চালু হল তা ছিল অভূতপূর্ব এবং দাসেদের প্রতি দাস মালিকদের আচরণ ছিল একটি উপনিবেশের পরাজিত জাতির প্রতি বিজয়ীর আচরণের চেয়েও সহিংস। কিন্তু এত কিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীতদাসেরা তাদের জাতিগত সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পেরেছিল যা বর্ণবাদী নির্যাতনের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল। স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বৈশিষ্ট্যর জন্য এই জনগোষ্ঠীর অনেক অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবী ও সক্রিয় কর্মী যেমন, এডওয়ার্ড ইয়াং, লুইস উডসন, মার্টিন ডিলানি নিজেদের একটি ঔপনিবেশিক জাতি হিসেবেই মনে করতেন। বিশ শতকে এসে তাদের কিছু কিছু নেতা যেমন ইমামি আবু বকরি ওবাদেল্লে এবং স্টোকলি কারমাইকেল যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই গোটাপাঁচেক কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত স্টেট নিয়ে একটি কৃষ্ণাঙ্গ দেশ গড়ারও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। গত শতকের ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে আফ্রিকান-আমেরিকানদের নাগরিক অধিকার আন্দোলন তুঙ্গে ওঠার অনেক আগে (১৯২০) লেনিনও কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের দ্বিতীয় কংগ্রেসে তাঁর ভাষনে পৃথিবীর দরিদ্র জাতিগুলোর মত যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে একটি মৌলিক অধিকার ও সুবিধাবঞ্চিত ঔপনিবেশিক সম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ক্যারিবিয়ানে ১৮৩৩ সালে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৬৩ সালে দাসত্ব প্রথা বিলোপ হলেও তাতে যে বর্ণবাদী সম্পর্কের কোনো হেরফের হয়েছিল কিংবা তাতে কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস কোনো সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছেছিল তা নয়। দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে তারা পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের জন্য স্বাধীন হলো বটে, তবে সেখানেও চরম বর্ণবাদী আচরণ ও অত্যাচারের শিকার হলো। আসলে প্রাক্তন দাসদের জন্য দাসত্ব প্রথার বিলোপ সে অর্থে কোনো মুক্তি আনেনি বরং অন্য ধাঁচে কলকারখানায় চাকরিবাকরিতে বর্ণবাদের শিকার হয়ে অভুক্ত থাকার জন্য তারা মুক্ত হলো। প্রাক-পুঁজিবাদী দাসত্ব বা পুরনো ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্ত হয়ে তারা নিক্ষিপ্ত হলো নতুন পুঁজিবাদী ঔপনিবেশিকতায় যেখানে বর্ণবাদ নানা সূক্ষ্ম প্রপঞ্চে তাদের অধীনস্থ করে রাখে। এজন্য বলা যায় দাসত্ব প্রথার অবসান ঘটলেও আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী বর্ণবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছিল সবসময়। ইম্যানসিপেশন অ্যাক্ট ১৮৬৩ দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী কাগজে কলমে মুক্তি পেলেও শ্বেতাঙ্গ মনস্তত্ত্বে তারা তখনও দাসই থেকে গিয়েছিল।
দাসত্বপ্রথা, ঔপনিবেশিকতা, এবং বর্ণবাদে যে দৈহিক এবং মানসিক অমানবিকতা যুক্ত রয়েছে তা প্রায় সমানভাবে দেখা যায় আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে। ক্যারিবিয়ান দাসত্বপ্রথার কথা বিস্তারিত লিখেছেন সি. এল. আর. জেমস তার ব্ল্যাক জ্যাকোবিন্স বইতে এবং এর সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় উনবিংশ শতকে লেখা যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রাক্তন ক্রীতদাস ও কৃষ্ণাঙ্গ নেতা ফ্রেডারিক ডগলাসের আত্মজীবনীর। তবে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে এবং আফ্রিকায় যেহেতু কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের সংখ্যাধিক্য, এজন্য তাদের সবসময়ের জন্য অমানবিক নির্যাতনে রাখা যেত না, আবার সেখানে শ্বেতাঙ্গ মনিব ও শাসকের সার্বক্ষণিক উপস্থিতিও সেভাবে ছিল না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যালঘু কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী সারাক্ষণই এই বর্ণবাদী অবিচারের শিকার হয়েছেন। দাস হিসেবে, কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবে তারা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক শোষণের শিকার হন।
শাসক ও শোষিতের মনস্তত্ত্বে ঔপনিবেশিকতার প্রভাব

মানুষের মনোজগতে ঔপনিবেশিকতার কিংবা অন্য কথায় একদল মানুষ কর্তৃক আরেক দল মানুষকে দখল করার ফলে এই দুই প্রকার মানুষের উভয়ের মানসিকতায় নানা নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়। ঔপনিবেশিক প্রভু একবার নিজেকে যদি এই বলে আশ্বস্ত করে যে যাকে সে দখল করেছে সে এবং তার সংস্কৃতি, তার আচার আচরণ, শিক্ষা দীক্ষা সবই অতিশয় নিম্ন পর্যায়ের তাহলে সে যেমন নিজের গর্হিত অপরাধের স্বপক্ষে একটা অজুহাত খাড়া করতে পারে, তেমনি প্রতিপক্ষকে নানা নেতিবাচক গুণে গুণান্বিত করে- যেমন সে অলস, কামুক, ভীতু, অকৃতজ্ঞ, দায়িত্বজ্ঞানহীন, পেটুক, লোভী, কৃপণ- তাকে শাসন করার যৌক্তিকতা খুঁজে পায়। এসব গৎ বাঁধা বৈশিষ্ট্য আরোপ করে সে কৃষ্ণবর্ণের মানুষের একটি প্রামাণ্য ছবি আঁকতে চেষ্টা করে।
এই প্রচেষ্টার দুটি প্রধান উদ্দেশ্য: উপনিবেশিত মানুষকে সব সময় দৌড়ের উপর রেখে তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে অর্থনীতি সচল রাখা, এবং তাকে তার নির্দিষ্ট জায়গাটা দেখিয়ে তাকে শোষণের জন্য অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি লাভ করা। কিন্তু এর আরেকটি কারণ আছে যা নাইজেরিয়ার লেখক চিনুয়া আচেবে উল্লেখ করেছেন তাঁর An Image of Africa প্রবন্ধে; আর সেটা হলো আফ্রিকাকে তারা ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখাতে চেয়েছে- “নেতির এমন এক জায়গা যা একই সঙ্গে দূরের এবং ইউরোপের আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের তুলনায় ঝাপসা এবং অস্পষ্ট।” আফ্রিকা আর তার জনগোষ্ঠী সম্পর্কে এ ধরনের নেতিবাচক ধারণার জন্য ইউরোপিয়ানরা আফ্রিকাকে এবং বলা যায় ব্যক্তি হিসেবে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে বুঝতে ব্যর্থ হয়। তাকে এক নামহীন গরিষ্ঠের সঙ্গে একীভূত করে তার ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য মুছে ফেলার চেষ্টা করে।
একই সঙ্গে প্রধানত নতুন শিক্ষানীতির মাধ্যমে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর মনে শ্বেতাঙ্গ শাসক এক উপকারী রক্ষাকর্তা, উদ্ধারকারী এবং শ্রেষ্ঠতর মানুষ হিসেবে নিজেদের একটা ভাবমূর্তি সৃষ্টির চেষ্টা করে; এবং সেভাবে তাদের শাসন করার স্বাভাবিক অধিকার তারই- এমন ধারণা দেওয়া হয় এবং উপনিবেশের মানুষকে নিজেদের বীরগাঁথা শেখানো পড়ানো হয় তা সেগুলো তাদের সামাজিক বাস্তবতায় যতই অবান্তর হোক। এভাবে ঔপনিবেশিত জনগোষ্ঠীরও যে একটা ইতিহাস আছে যা নিয়ে সে গর্ব করতে পারে- সে কথা তাকে ভুলিয়ে রাখা হয়। বস্তুত উপনিবেশিক শিক্ষা দীক্ষার উদ্দেশ্যই ছিল শাসিতদের ভেতর, যেমন এয়ামে সেজায়ার বলেন, “একদল অন্ধ মানুষ সৃষ্টি করা, জড়বুদ্ধির বুদ্ধিজীবী, কয়েক হাজার অনুগত কর্মচারী, কেরানী এবং ভাষ্যকার পয়দা করা, শাসন চালাতে যাদের নিয়ত প্রয়োজন হয়।” ওয়ালটার রডনির মতে ঔপনিবেশিক শিক্ষার উদ্দেশ্যই ছিল অধস্তন করে রাখা, শোষণ করা, মানসিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা এবং এভাবে অপ্রাগ্রসরতার সূচনা করা। সেনেগালের নেতা জুলিয়াস নায়ারে স্বাধীনতা পরবর্তী নির্দেশে ঔপনিবেশিক শিক্ষার সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কথা বলেন এভাবে: ঔপনিবেশিক সরকার যে শিক্ষা নীতি চালু করেছে তা তরুণদের নিজেদের দেশ সেবা করার জন্য নয়; বরং এর উদ্দেশ্যই হল উপনিবেশিত সমাজে ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ সৃষ্টি এবং শাসকদের স্বার্থে কাজ করার জন্য একদল কর্মী বাহিনী গড়ে তোলা। এই শিক্ষা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে এমন এক শ্রেণী সৃষ্টি করে যারা উপনিবেশিক শাসকের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। এই শিক্ষার আওতায় ক্রমে এমন এক শ্রেণী গড়ে ওঠে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চেয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র এবং শ্রেষ্ঠ মনে করতে থাকে। এদেরই একটা অংশ তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে, তাদের সামষ্টিক স্মৃতিতে গড়ে ওঠা সংস্কৃতি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করে এবং হীনমন্যতায় ভোগে। এভাবে তারা শেকড়চ্যূত হয় এবং মরিয়া হয়ে পড়ে ঔপনিবেশিক শাসকদের সঙ্গে একীভূত হতে এবং তাদের কেউ কেউ শাসকদের সঙ্গে একীভূত হয়ে অদৃশ্যও হয়ে যায়, কিন্তু তাদের “সাফল্য কাহিনী” বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে কোনো ভূমিকাই রাখে না এবং এই নাটক চলতেই থাকে। আবার এই নবদীক্ষিত শেকড়চ্যূত সুশীল সমাজের অধিকাংশই শাসকদের ঘরে ঠাঁই না পেয়ে কিংবা সেখানে প্রবেশাধিকার থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এক ধরনের বিমূর্ত শূন্যতায় বাস করতে থাকে।
আফ্রিকান, আফ্রিকান-ক্যারিবিয়ান এবং আফ্রিকান-আমেরিকানদের ঔপনিবেশিকীকরণের শক্তিশালী হাতিয়ার হলো তাদের ভেতর শাসকদের ভাষার প্রচলন। বিদেশি প্রভুদের ভাষার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে আফ্রিকান এবং ক্যারিবিয়ানদের শিক্ষিত শ্রেণীর ওপর। এরা অবিলম্বে দ্বিভাষিক হয়ে পড়ে কারণ জন্মসূত্রে মাতৃভাষা তারা ভুলতে যেমন পারে না তেমনি ইউরোপীয় প্রভুদের ভাষায় মাতৃভাষাসুলভ দক্ষতা অর্জনেও ব্যর্থ হয়। এভাবে গড়পড়তা ঔপনিবেশিক জনগণ এমন একভাষিক দুর্বোধ্যতা অর্জন করে যা তাদের সাংস্কৃতিক ও অস্তিত্ববাদী দুর্বোধ্যতা আরো বাড়িয়ে দেয়। তবে এদের যারা সৃজনশীল লেখক যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ফ্রেডারিক ডগলাস, পল লরেন্স ডানবার, ডব্লু ই বি দুবয়, রিচার্ড রাইট, জেমস বলডুইন, আমিরি বারাকা, টনি মরিসন, অ্যালিস ওয়াকার; ক্যারিবিয়ানে জর্জ ল্যামিং, এমে সেজেয়ার, ডেরেক ওয়ালকট; এবং আফ্রিকায় চিনুয়া আচেবে, ওলে সোইংকা, নগুগি ওয়া থিওঙ্গ, আই কোয়ি আরমা, ফ্লোরা নোয়াপ্পা, শেখ হামিদু কান, বেসি হেড, পিটার আব্রাহামস প্রমুখ ঔপনিবেশিক প্রভূর ভাষায় লিখলেও তাঁরা নিজেদের মতো করে একটা নতুন ভাষা তৈরি করেন। এই ভাষাতেই তাঁরা নিজেদের সমাজ বাস্তবতা প্রকাশ করেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই এই নতুন ভাষা তৈরি করার কথা বলেছেন ফরাসি-ক্যারিবিয়ান লেখক এমে সেজেয়ারও: “আমি সবসময়ই নতুন ভাষা তৈরীর চেষ্টা করেছি যে ভাষায় আফ্রিকান ঐতিহ্যের কথা বলা যায়। আমার জন্য ফরাসি ছিল একটা যন্ত্র যা ব্যবহার করে আমি প্রকাশের একটা নব মাধ্যম সৃষ্টির চেষ্টা করেছি। আমি চেয়েছি অ্যান্টিলিয়ান ফরাসি তৈরি করতে, এক কৃষ্ণাঙ্গ ফরাসি যা ফরাসি থাকবে কিন্তু পাবে এক কৃষ্ণাঙ্গ চরিত্র।” একইভাবে আচেবেও বলেন যে তিনি ইংরেজিতেই লিখবেন তবে ইংরেজের মতো নয়, তাঁর নিজের মতো করে। এবং তিনি করেছেনও তাই।
মাতৃভাষার মাধ্যমেই মানুষ তার মৌলিক জীবনের সঙ্গে, তার উৎপাদনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে। মাতৃভাষার মাধ্যমেই সে মূল্যবোধ শেখে যা ক্রমে পরিপক্ক হয়ে স্বতপ্রমাণিত সত্যে পর্যবসিত হয় এবং তা সংস্কৃতি তথা তার আত্মপরিচয় এবং সামগ্রিক অস্তিত্ব নির্মাণে সাহায্য করে। মাতৃভাষা এভাবে মানুষকে নিজের সত্তার সঙ্গে, অন্যের সত্তার সঙ্গে, এবং প্রকৃতির সঙ্গে যোগসূত্রে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। “ভাষা ও আফ্রিকান সাহিত্য” শীর্ষক প্রবন্ধে নগুগি থিওঙ্গ ভাষা একটি সম্প্রদায়ের মৌলিক জীবনের জন্য কতটা অপরিহার্য তা বলতে গিয়ে লিখেছেন: “ভাষার মাধ্যমেই সেই ভাষায় কথা বলা সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশিত হয়। ভাষা এজন্য আমাদের সঙ্গে অবিভাজ্য; আমাদের বিশেষ গড়ন, বিশেষ চারিত্র্য, বিশেষ ইতিহাস এবং বিশ্বের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে তা অপরিহার্য।”
এজন্য উপনিবেশের জনগণের ভাষা যখন কেড়ে নিয়ে সেখানে প্রভুর ভাষার প্রচলন ঘটলো তখন আফ্রিকার মানুষ তার অস্তিত্ব থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে তার বৃহত্তর সমাজের কাছে একজন বেগানা মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো। এই বিষয়টি ইউরোপীয়দের ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টির চেষ্টায় আফ্রিকা ও ক্যারিবিয়ানের বহু কৃষ্ণাঙ্গ লেখককেই প্রভাবিত করেছে। তাদের দেশের বিপুল সংখ্যাধিক্য মানুষ ইউরোপের ভাষায় কথা বলে না; ওই ভাষা পড়তে, বলতে বা লিখতেও তারা জানে না। এখন নিজেদের মানুষ থেকে দূরত্ব সৃষ্টির প্রায়শ্চিত্ত করতে কেউ কেউ যেমন নগুগি নিজেই ফের মাতৃভাষায় লিখতে শুরু করেছিলেন কিন্তু তাতে পাঠক সংখ্যা যথেষ্ট কম হওয়ায় তিনি আবার ঔপনিবেশিক ভাষা ইংরেজিতে লিখতে শুরু করেন।
আফ্রিকান আমেরিকানদের অবস্থান এক্ষেত্রে একটু ভিন্ন। ওদের তো জবরদস্তি করে আনা হয়েছে এবং পরিস্থিতির শিকার হয়েও অনেক সময় ওরা আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে এসে ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছে। ওদের সংখ্যা যেমন কম, তেমনি বহু গোত্র থেকে আসায় ওদের কোনো সাধারণ আফ্রিকান ভাষাও ছিল না। ফলে শুরু থেকেই তারা ইংরেজি শিখতে বাধ্য হয়েছে এবং এই ভাষার সর্বগ্রাসী আবহেই তাদের বেড়ে ওঠা ও কালাতিপাত করা। ওরা এই বিদেশে যে বিচ্ছিন্নতা বোধ করে তা যত না আফ্রিকার শিকড় থেকে বিচ্যুত হবার জন্য, তার চেয়ে বেশি বর্ণবাদী আচরণের জন্য। এই বর্ণবাদী আচরণে মালিকরা ওদের গবাদিপশুর মতো সম্পত্তি বলে মনে করতো; ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা সার্বক্ষণিক হতাশা, বিতৃষ্ণা আর দৈহিক ও মানসিক অশান্তিতে ভুগতো। বর্ণবাদী বিচ্ছিন্নতাবোধই হয়ে দাঁড়ায় তাদের অস্তিত্বের যাবতীয় বৈশিষ্ট্যের নিয়ামক। অন্যদিকে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে ইউরোপীয় শাসকদের ব্যাপক উপস্থিতি না থাকায় সেখানকার পরাধীন জনগণের বর্ণবাদী আচরণের তেমন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়নি। এবং তাদের সাহিত্যেও বর্ণবাদ মুখ্য কোনো বিষয় হয়ে ওঠেনি।
ঔপনিবেশিকতা এবং বর্ণবাদের সঙ্গে সহিংসতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সেজেয়ারের লেখায় বিষয়টি এভাবে ব্যক্ত হয়েছে : “… ঔপনিবেশিক শাসক এবং শাসিত যখনই মুখোমুখি হয়েছে, তখন আমি দেখি কেবল শক্তি প্রয়োগ, পাশবিকতা, হিংস্রতা, ধর্ষকাম, অত্যাচার এবং সংঘর্ষ । এই দুই দলের মধ্যে রয়েছে কেবল বাধ্যতামূলক শ্রম, ভীতি ও চাপ প্রদর্শন, পুলিশ, করারোপ, চুরি, বলাৎকার, জোরপূর্বক শস্য আদায়, ঘৃণা, অবিশ্বাস, ধৃষ্টতা প্রদর্শন, আত্মপ্রসাদ, গোয়ার্তুমি … অধঃপতিত জনতা।” এমনকি সহিংসতা যদি দৈহিক নাও হয় তো ঔপনিবেশিক শিক্ষা এবং পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিহিত থাকে এই সহিংসতা।
দৈহিক ও মানসিক সহিংসতায় প্রতিষ্ঠিত বলে এবং শাসক শাসিতের সম্পর্ক অস্ত্র ও রক্তে গাঁথা বলে মাঝে মাঝেই শাসিত মানুষ সহিংসতার মাধ্যমেই প্রতিদান দিয়ে থাকে। এজন্য উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং আফ্রিকার ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা রয়েছে সহিংস প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর স্বাধীনতার বীরত্ব গাথা। শোষিত জনগণের প্রতিরোধ অনেকটাই অবদমনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, কিন্তু দীর্ঘকাল বহাল থাকায় শোষকের সহিংসতা যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় তখন শোষিতের সহিংসতাও দমন নীতির বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়ে শেষে মুক্তির আন্দোলনে পরিণত হয়।
মুক্তির সংগ্রামে আফ্রিকার বংশোদ্ভূত জনগণ অনুপ্রেরণা পায় নিজেদের বর্ণভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে। নিজেদের শেকড় সন্ধান করে তারা অতীত খুঁড়ে নানা গৌরবময় অনুষঙ্গ বের করে। ইউরোপীয়রা তাদের ওপর যেসব নেতিবাচক অভিধা আরোপ করেছিল সেগুলোই তাদের সংগ্রাম ও পুণর্জাগরণের মূল প্রতিপাদ্য হয়ে দাঁড়ায়। সে সবই তাদের জন্য ইতিবাচক অনুষঙ্গ হয়ে এখন তাদের মুক্তি সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কৃষ্ণাঙ্গ বুদ্ধিজীবী সমাজই এই আত্মপরিচয়ের সন্ধানে শেকড়মুখী হবার কথা বলে। লোকসংস্কৃতিকে জানার এবং নিজেদের মূল ঐতিহ্যে ফেরার কথাটা জোরেশোরে বলেন কৃষ্ণাঙ্গ বুদ্ধিজীবীরা। এডওয়ার্ড ব্রাথওয়েইট বলেন, “অতীত এবং খিড়কিপথের সন্ধান একই সঙ্গে বর্তমান ও ভবিষ্যতের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে পর্যবসিত হয়। এই সংগ্রাম থেকে আমরা আবার মানুষ হই, নিজেরাই গড়ি নিজেদের, আবিষ্কার করি নতুন ভাষা।” (Is Massa Day Dead?:Black Moods in the Caribbean)
নিজেদের অতীত জানার, বর্তমানকে মূল্যায়ণ করার, এবং ভবিষ্যতের কর্তব্য কর্ম নির্ধারণ করার প্রেরণায় আফ্রিকার বংশদ্ভূত লেখকরা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের শাসনে তাদের অভিজ্ঞতার কথা নিজেদের লেখায় নানাভাবে পর্যালোচনা করেছেন। তারা যে কেবল ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন তা নয়, ইউরোপিয়ান শাসকরা তাদের পার্থিব ও আত্মিক জীবন যে লণ্ডভণ্ড করেছিল তাও সংগঠিত করার দুরূহ কাজে নিয়োজিত হয়েছিলেন। তাদের বর্ণবাদী ও ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার আলোকে তারা নিজেদের আদি সংস্কৃতির পরিচয় জানতে, ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব তাদের কতভাবে কত স্থায়ী জখমের চিহ্ন রেখেছে তার খোঁজ নিতে এবং তাদের বিরুদ্ধে যত বর্ণবাদী কুৎসা রটানো হয়েছিল তা মিথ্যা প্রমাণিত করতে উদ্যোগী হন এবং তারাও যে বিশ্বের অন্য যেকোনো জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক, শৈল্পিক সৃষ্টি, মান মর্যাদা এবং মানবিক সীমাবদ্ধতার সমান সে কথাই নানাভাবে তাদের শিল্প মাধ্যমে বলার চেষ্টা করেন। উপনিবেশিক আধিপত্যবাদে সৃষ্ট দারুন বিভ্রান্তি আর বিকৃত ব্যাখ্যার কথা আফ্রিকান-আমেরিকান লেখক রিচার্ড রাইট এভাবে বলেছেন: “লক্ষ্য কোটি কালো, বাদামি, আর হলুদ জনগোষ্ঠীর অতীত ইতিহাস আর ব্যক্তিত্ব শাসকদের সাহিত্যে যেভাবে বিকৃত করা হয়েছে তা বিভ্রান্তিকর, এবং নতুন সাহিত্য রচনা করে তাকে অবশ্যই শক্ত হাতে ঘোঁচাতে হবে। এই নতুন সাহিত্যে পাঠক প্রবেশ করবে এমন এক জগতে যেখানে ভয়ংকর বিসদৃশ সব ছায়ামূর্তি পরস্পর টক্কর খায়- সাদা হয়ে যায় কালো, মৃতরা প্রাণ পেয়ে ফিরে আসে জীবনে, মাথা নেমে আসে পায়ে- যতক্ষণ না আপনি ভাবছেন আপনি বুঝি বাইবেলের সাতমাথা আর দশ শিঙঅলা জন্তুকে সাগর থেকে মাথা তুলতে দেখছেন।” এভাবে রাইট মনে করতেন ঔপনিবেশিক শাসন বাস্তবিকই এমন এক অনৈতিক ব্যাপার ছিল যার ভয়াবহতা এমনকি মার্কস-লেলিনও ভাবতে পারেননি। কৃষ্ণাঙ্গ লেখকরা এজন্যই মনে করতেন যে তাদের জাতির ইতিহাসকে সত্যের আলোকে উপস্থাপন করা তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
নিজেদের দুনিয়াকে মেরামত করে বলতে গেলে একেবারে শুরু থেকে সেখানে জিনিসপত্রের নাম দেয়ার আদমসদৃশ দায়িত্ব পালনের ব্রত নিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ লেখকরা শিল্পচর্চায় নেমে পড়েন এবং যে-দুনিয়ায় তাঁরা বাস করেন সেখানে তাদের দুঃখ কষ্ট, আনন্দ নিয়ে নিজেদের আঁকেন তো বটেই, উপরন্তু তাঁদের ভেতর বর্ণবাদী ও ঔপনিবেশিক শক্তি যেসব বৈশিষ্ট্যকে দোষ হিসাবে দেখাতে চেয়েছে সেগুলোকেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে গৌরব দানে সচেষ্ট হন। এই উদ্যোগ থেকেই তারা শেক্সপিয়রের দ্য টেম্পেস্ট নাটকের এক কৃষ্ণাঙ্গ চরিত্র ক্যালিবানকে মহিমা দান করে এক ধরনের প্রতিবাদী সাহিত্য রচনায় নিয়োজিত হন। এ সম্পর্কে আগামী কোনো সংখ্যায় আলোচনা করা যাবে।
(খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, প্রাবন্ধিক)



















