‘বাংলা ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষা’ এবং ‘বাংলা ভাষার বিপন্নতা’ সংক্রান্ত উদ্বিগ্নতার প্রবণতা দুই বাংলাতেই বেশ দেখা যায়, বিশেষত ভাষার মাসে তা আরো প্রকট হয়ে ওঠে। দুই বাংলার ভাষাপ্রেমীদের মধ্যে ভাষা রক্ষা ও বিকাশসংক্রান্ত যে প্রবণতা বা প্রচেষ্টাসমূহ দেখা যায়, যেমন – বাংলা ভাষাকে বিভিন্ন ভাষার শব্দের মিশ্রণজনিত বিকৃতির থেকে রক্ষা করা, অন্য ভাষার আগ্রাসনে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব সংকটের আশংকা, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিজস্ব মান ভাষা চালু, প্রশাসন সহ সর্বস্তরে বাংলার চর্চা এবং প্রচলনের জন্য নানা প্রস্তাব ও দাবী – তা অনেকক্ষেত্রে আন্তরিক হলেও, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে (দেশীয় ও আন্তর্জাতিক) এড়িয়ে যাওয়ার ফলে এসব প্রচেষ্টা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অর্থহীন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গোষ্ঠির ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক যে প্রবণতা-প্রচেষ্টা, তা সাম্প্রতিক কোনো ব্যাপার না, বরং এর একটা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে। মোটাদাগে বললে, উনিশ শতকের প্রথমদিকে সংস্কৃত ভাষাকে গোড়া পত্তন ধরে নিয়ে বাংলা ভাষায় কৃত্রিমভাবে প্রচুর সংস্কৃত শব্দ আমদানি করা হয়েছিল; একইভাবে উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে দেশভাগের পরেও বাংলাভাষাকে হিন্দুয়ানি প্রভাবমুক্ত করতে কৃত্রিমভাবে আরবি, ফার্সি ও উর্দু শব্দের প্রচলনের চেষ্টা করা হয়। বলা বাহুল্য, কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দ্বারা কৃত্রিমভাবে চাপিয়ে দেওয়া এসব সংস্কৃত কিংবা আরবি-ফার্সি শব্দ সাধারণ জনগণের গ্রহণ করার কোন আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা ছিল না। ভাষার সার্বজনীন চরিত্রকে অস্বীকার করে ধর্ম এবং জাতীয়তার মোড়কে জবরদস্তিভাবে আবদ্ধ করার তৎকালীন প্রচেষ্টাটাই ছিল অবৈজ্ঞানিক। আজকের সময়ে, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রের শাসন কাঠামো, ভাষার চরিত্র ও ভাষা ব্যবহারকারী জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন রেখে সেই ভাষা সংক্রান্ত যে আকাঙ্ক্ষা বা উদ্বিগ্নতা দুই বাংলাতেই সাধারণভাবে দেখা যায়, সেটাও অনেকটা অবৈজ্ঞানিক হয়ে দাঁড়ায়।
২
মার্কসীয় তত্ত্ব অনুযায়ী প্রতিটি সমাজেই একটা ভিত্তি (base) ও উপরিকাঠামো (superstructure) থাকে। ভিত্তি হলো একটা সমাজের বিকাশের নির্দিষ্ট স্তরে তার অর্থনৈতিক মূল কাঠামো (উৎপাদনের উপায় ও সম্পর্ক), আর উপরিকাঠামো হল অর্থনৈতিক মূল কাঠামো বা ভিত্তি অনুযায়ি গঠিত হওয়া সেই সমাজের আইন-কানুন, মতাদর্শ, রাজনীতি, ধর্ম, শিল্পকলা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ভিত্তিকাঠামোকে কেন্দ্র করে উপরিকাঠামো গড়ে উঠছে এবং প্রভাবিত হচ্ছে।
মার্কসবাদের এই তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে স্টালিন বিপ্লব পরবর্তী রাশিয়ায় রুশ ভাষার পরিবর্তন সম্পর্কে যা বলেছিলেন তার সারমর্ম ছিল, রাশিয়ায় পুঁজিবাদের ভিত্তি কাঠামোকে সরিয়ে সমাজতন্ত্রের ভিত্তি কাঠামো প্রতিস্থাপিত হলো, ফলস্বরূপ পুঁজিবাদের উপরিকাঠামোও সমাজতন্ত্রের নিজস্ব উপরিকাঠামো দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে লাগল। বিপ্লব পূর্ববর্তী রাশিয়ার পুরাতন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মতাদর্শ সমাজতন্ত্রের নতুন মতাদর্শের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হল, কিন্তু রুশ ভাষার ক্ষেত্রে কোন মৌলিক পরিবর্তন ঘটে নি। নতুন রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা, নতুন সামাজিক সম্পর্ক ও নৈতিকতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিকাশের সম্পৃক্ততার ফলে রুশ ভাষার শব্দভাণ্ডারে অনেক নতুন শব্দ যুক্ত হয়েছে, যুক্ত হয়েছে নতুন প্রকাশভঙ্গিমা। একইভাবে অনেক শব্দ নতুন করে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং অনেক শব্দ বাদও পড়ে গেছে। এসব পরিবর্তন মানে এই নয় যে ভাষা বদলে গেছে, এসব শব্দগত এবং প্রকাশভঙ্গিমার ভাবগত (expression) পরিবর্তন ছাড়া রুশ ভাষার মৌলিক কাঠামোগত বা ব্যাকরণগত কোন পরিবর্তনই ঘটে নি। স্টালিনের মতে, ভাষার বুনিয়াদ নির্মিত হয় তার মৌলিক শব্দভাণ্ডার ও ব্যাকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে। বুর্জোয়া এবং সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলেও, যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে রুশ ভাষা উভয় সংস্কৃতির স্বার্থই পূরণ করতে পারছিল। ফলে সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটলেও ভাষার পরিবর্তন ঘটেনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যান্য সকল ভাষার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটেছিল। স্টালিন জোর দিয়ে বলেছিলেন, ভাষাকে উপরিকাঠামো হিসেবে গণ্য করা যাবে না। অর্থাৎ, ভিত্তি কাঠামোর পরিবর্তন ঘটলে ভাষারও পরিবর্তন ঘটবে এমন ধারণা ভুল।
স্টালিনের আলাপ থেকে বোঝা যায়- প্রথমত, শব্দগত বা শব্দের প্রকাশভঙ্গি পরিবর্তন মানেই ভাষার পরিবর্তন না। দ্বিতীয়ত, ভাষা শ্রেণী ও সংস্কৃতি নিরপেক্ষ। একটা ভাষা একই সাথে শাসক ও শোষিত শ্রেণী, বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত সংস্কৃতি, পুরনো ও নতুন রাষ্ট্র বা সমাজ কাঠামো- এর সাথে সংযোগ ঘটাতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত ভাষার এই সার্বজনীন চরিত্র অক্ষুন্ন থাকছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার পরিবর্তন বা বিলোপ হওয়ার প্রশ্ন আসে না। তাই জোর করে ভাষাকে কোন ধর্ম বা শ্রেণীর আওতাভুক্ত করাটা অনর্থক চেষ্টা, যে চেষ্টার ভেতরে বাংলা ভাষাকে যেতে হয়েছিল বহুবার।
কোন জনপদে বসবাসরত সমস্ত শ্রেণীর মানুষদের সম্মিলিত অবদানে একটা ভাষার কাঠামো বা কঙ্কাল গড়ে উঠে। প্রজন্মান্তরে তাদের নিত্য যাপনে, বিভিন্ন জনপদের সাথে নিত্য মিথস্ক্রিয়ায় ভাষার সমৃদ্ধি ঘটে, রূপেরও পরিবর্তন হয়। নতুন নতুন শব্দ, ধ্বনি যুক্ত ও প্রতিস্থাপিত হয়। পুরাতন শব্দ পরিবর্তিত বা বিকৃত হয় কিংবা হারিয়ে যায়। বলা যায়, ভাষার কঙ্কালে নতুন মাংস বা মেদ যুক্ত হতে থাকে, যা সময়ের সাথে আবার ঝরেও যায়। এতে ভাষার স্বাস্থ্যহানি বা স্বাস্থ্যবৃদ্ধি ঘটতে পারে, কিন্তু কঙ্কালের বা কাঠামোর কোন পরিবর্তন হয় না। ভাষার কাঠামোর পরিবর্তন মানে ভাষার অস্তিত্বেরই পরিবর্তন।
ব্যাকরণবিদগণের কাজ হলো ভাষার এই কাঠামো বা কঙ্কালকে আবিষ্কার করা। এই কাঠামো যেহেতু নির্দিষ্ট জনপদের সমস্ত মানুষের সম্মিলিত অবদানের ফল, তাই তাকে নিজস্ব রাজনৈতিক ভূখণ্ড বা জাতি-ধর্মগত সীমানাতে বেধে রাখতে গেলেই ঝামেলা বাধে। যে ঝামেলাটা পাকিয়েছিলেন বাংলা ভাষার ব্যাকরণবিদেরা।
অষ্টাদশ শতাব্দীর আগেও বাঙলা ভাষার বিশেষ কোন নাম ছিল না। একে কখনো দেশি, লৌকিক, প্রাকৃত অথবা শুধু ভাষাও বলা হতো। পর্তুগীজরা বলত বেঙ্গালা, ইংরেজরা বলত বেঙ্গলি, উনবিংশ শতাব্দীর পণ্ডিত লেখকরা বলতেন গৌড়ীয় ভাষা। এরপর তা বঙ্গ, বাঙ্গালা নাম নিল। কালক্রমে আজ তা বাঙলা ভাষা। বাঙলা ভাষার যে প্রকৃত কাঠামো গড়ে উঠেছিল তার পিছনে রয়েছে বিস্তৃত অঞ্চলব্যাপী ছড়িয়ে থাকা জনসাধারণের সম্মিলিত অবদান। এই বিষয়ে সুকুমার সেন বলেন- “বাঙ্গালা ভাষার যখন উৎপত্তি হয় তখন সে ভাষা আধুনিক বাঙ্গালা দেশের সীমানা ছাপাইয়াও বেশ খানিক দূর অবধি বিস্তৃত ছিল।” ভাষার নামকরণের বিষয়ে সুকুমার সেন বলেন- “অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকেই দেখিতেছি যে বাঙ্গালা দেশের লোক বুঝাইতে বাঙ্গালী শব্দ চলিয়া গিয়াছে। এখন, একই শব্দ জাতি ও ভাষা অর্থে ব্যবহৃত হইতে থাকিলে অসুবিধা হয় অথচ বাঙ্গালা (দেশের ) ভাষা সমাস করিয়া লইলে কোনই অসুবিধা হয় না।” বাঙলা অঞ্চলের রাজনৈতিক সীমানার বাইরের অধিবাসীদেরও বাঙলাভাষার কাঠামো গঠনে অবদান থাকলেও, তৎকালীন ব্যাকরণবিদেরা সেই কাঠামো আবিষ্কারের কোন চেষ্টা করেন নি। আঠারো শতক থেকেই বাঙলা ব্যাকরণ লেখার প্রয়াস শুরু হয়। তখনকার দেশি এবং বিদেশি অভিধানপ্রণেতা ও ব্যাকরণবিদেরা বাঙলাকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে না দেখে একে সংস্কৃত নির্ভর ভাষা হিসেবে গণ্য করেছিলেন। ফলে সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুকরণে বাঙলা ব্যাকরণ রচিত হয়েছিল, অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষার মত একটা স্বতন্ত্র ভাষার কাঠামো বাংলা ভাষার উপর চাপিয়ে দিয়ে বাংলা ব্যাকরণ হিসেবে পরিচিত করানো হল। হুমায়ূন আজাদ এরূপ ব্যাকরণকে তাই বাঙলা ভাষার সংস্কৃত ব্যাকরণ বলেছিলেন। যদিও “বাঙলা সংস্কৃতির দুহিতা” মনে করা ব্যাকরণবিদদের সমালোচনা করে এগিয়ে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দসুন্দর ত্রিবেদী প্রমুখ। তাঁরা বাঙলাকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে গণ্য করেন এবং বাঙলা ব্যাকরণকে সংস্কৃতের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে বিজ্ঞানভিত্তিক ও স্বায়ত্তশাসিত রূপ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্ত তাঁদের এই চাওয়া পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ভাষা প্রকাশ বাঙলা ব্যাকরণ প্রচলিত সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুকরনের ধারা থেকে অনেকটাই বের হয়ে আসে।
বাঙলা অঞ্চলে বৃটিশ উপনিবেশের অধীনে নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো ও বাজার গড়ে ওঠে, সে বাজারকে কেন্দ্র করে যে নগর ব্যবস্থা তার রাজধানী ছিল কলকাতা। এই রাজধানীকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলের বাঙলা ভাষাভাষি মানুষের মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে, দাপ্তরিক-প্রশাসনিক কাজের সুবিধাসহ পণ্য, পেশাগত এবং প্রকাশনার বাজারে জায়গা করে নেওয়ার স্বার্থে একটি মানভাষা তৈরির প্রয়োজন দেখা দেয়। আঠারো শতকের শেষ থেকে শুরু করে গোটা উনিশ শতক ধরেই বাঙলা ভাষার মানরূপ সৃষ্টির প্রয়াস চলে। অতঃপর উনিশ শতকের মাঝামাঝি সর্ববঙ্গীয় বাঙলা ভাষা সৃষ্টির প্রচেষ্টায় সংস্কৃত নির্ভর সাধু ভাষাকেই মানভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়, যেটা ছিল শুধুমাত্র লেখার উপযোগী, বলার নয়। সাধুভাষার এরূপ স্থবিরতার জন্য পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী সহ আরো অনেকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদানে চলিত রীতি মান ভাষা হিসেবে চালু হয়।
এই মান ভাষা সর্ববঙ্গীয় ভাষারূপ না নিয়ে শুধু মাত্র কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল – কারণ বাংলা মানভাষার গঠন ও বিকাশের দায়িত্বে যে শ্রেণীটা ছিল তাঁরা মূলত বৃটিশ শাসনের সুবিধাভোগী নব্য হিন্দু মধ্যশ্রেণী। মুসলিম অভিজাত ও মধ্যশ্রেণী তখন বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যকে ভারতীয় সংস্কৃতি হিসেবে এড়িয়ে গিয়ে আরবের সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি ঝুঁকে পড়েছিল। বাঙ্গালি না মুসলিম এই আত্মপরিচয়ে জর্জরিত হয়ে মধ্যশ্রেণীর মুসলমান যখন খোদ নিম্নশ্রেণীর মুসলমান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তখন বৃটিশদের সুবিধাভোগী হিন্দু জমিদার ও মধ্যশ্রেণীও এখানকার সংস্কৃতি থেকে মুসলমানদের অবদান বাতিল করে দিয়ে ভাষা, ইতিহাস ও সাহিত্যচর্চা নিজেদের দখলে নিল। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, নিম্নশ্রেণীর মুসলমানদের মধ্যে আত্মপরিচয়ের এই সংকট ছিল না, ফলে লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতিতে নিম্নবর্গের হিন্দুদের পাশাপাশি তাদেরও প্রচুর অবদান ছিল। দীনেশ্চন্দ্র সেনের মতে, বাংলার গ্রাম্য সংস্কৃতি, লোককথা উপকথাগুলো সবচেয়ে বেশি সংরক্ষিত হয়েছিল নিম্নবিত্ত মুসলমানদের দ্বারা। এরকম আরো অনেক ক্ষেত্র থেকে মুসলমানদের অপরায়ন করে দিয়ে (অপরায়নের শিকার হয়েছে নিম্নবর্ণের হিন্দুরাও) এখানকার মধ্যশ্রেণীর হিন্দু পণ্ডিতেরা বাঙলা ভাষা, ব্যাকরণ এবং মানভাষাকে সংস্কৃত শব্দ ও নিয়মকানুনের ভারে জর্জরিত করে ফেলল। এটাও সত্য, পাল্টাভাবে এই শ্রেণীরই একটা অংশ এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল।
মধ্যযুগে সব শ্রেণীর হিন্দু-মুসলমান বাঙলা সাহিত্যে সম্মিলিত অবদান রাখলেও, বৃটিশ আগমনের পর মধ্যশ্রেণীর মুসলমানরা নিজস্ব আত্মপরিচয়ের সংকটের কারণে কার্যকর কোন অবদান রাখতে পারেনি। ফলে কোন কার্যকর মতাদর্শিক প্রতিরোধ ছাড়াই এখানে ব্রাহ্মণ্যবাদ আসন গড়ে বসতে পেরেছিল। ভাষায় যার প্রভাব পড়েছিল সংস্কৃতায়নের দ্বারা। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দিয়েছিল আরবি ফার্সি শব্দ দ্বারা ভাষাকে মুসলমানি চরিত্র দান করা। কিন্তু সাধারণ জনতার নিত্যদিনের ভাষায় এসব শব্দ গৃহীত হয়নি। কোন গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান ভাষায় কোন শব্দ বা রীতি প্রচলন করতে চাইলেও সেটা তখনি প্রচলন হবে যদি তা জনসাধারণের ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটাতে পারে। যেমন, বাঙলা মান ভাষার প্রয়োজন মেটানোর জন্যে সাধুরীতি চালু করা হলেও, এই রীতির অনমনীয় ও স্থবির স্বভাব এখানকার মানুষদের ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটাতে পারে নি, ফলে চলিত রীতি বাংলার মান ভাষা হিসেবে চালু হয়ে গেল। এই রীতিতে বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের ভাষার প্রতিফলন না থাকার সমালোচনা থাকলেও, সাহিত্যচর্চা, প্রকাশনা, আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগের মাধ্যম সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবিকল্প প্রয়োজন হিসেবেই তা এখনো প্রমিত বাঙলা হিসেবে চালু হয়ে আছে। একইভাবে চালু রয়ে গেছে বাঙলা ব্যাকরণ ও অভিধান। কিন্তু এদের উৎপত্তি ও বিকাশের গলদের কারণে এখনো বাঙলা ভাষার ব্যবহারের বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা ও জটিলতা রয়ে গেছে।
৩
বাংলাদেশে প্রমিত বাংলা ব্যবহারে কালক্রমে উচ্চারণ ও শব্দগত অনেক পরিবর্তন এসেছে। যেমন গেসিলাম, খাইতেসিলাম প্রভৃতি। এই পরিবর্তনসমূহ এখনো লেখার ক্ষেত্রে চালু না হলেও নাটক, সিনেমা, বক্তব্যের ক্ষেত্রে অনেকাংশে চালু হয়ে যাচ্ছে। এই ব্যাপার নিয়ে দুই ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। প্রথমত, প্রমিত বাংলার শুদ্ধতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগ ও আশংকা থেকে এটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, দ্বিতীয়ত, এই উচ্চারণ ও শব্দরীতির ভিন্নতাকে ধারণ করে পশ্চিমবঙ্গের বিপরীতে বাংলাদেশের নিজস্ব মান ভাষা তৈরি করা।
মান বাংলার শুদ্ধতার ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগ শুধুমাত্র উচ্চারণ ও শব্দগত পরিবর্তনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ না, বিদেশি শব্দ অন্তর্ভুক্তি হয়ে একে কলুষিত করার অভিযোগও আছে। কলকাতায় আরবি ফার্সি শব্দ ব্যবহারের ব্যাপারে এখনো উনিশ শতকের মতো সাম্প্রদায়িক বিরোধিতার প্রবণতা রয়েছে। আনন্দবাজার পত্রিকার আরবি ফার্সি সহ বিদেশি শব্দকে (এমনকি তা ব্যক্তি বা স্থানের নাম হলেও) জবরদস্তিমূলক বাংলায় রূপান্তরের প্রচেষ্টা চোখে পড়ার মত। এরূপ প্রচেষ্টায় ভাষা কতদূর বিশুদ্ধ থাকবে বা বিস্তৃত হবে সেটা বোঝার জন্য আজকের দুনিয়ার বাস্তবতায় ভাষাকে দেখতে হবে।
পুঁজিবাদের নিওলিবারেল যুগের যে পণ্যায়ন প্রক্রিয়া তার থেকে ভাষাও বাদ পড়ছে না। এই যুগে একটা ভাষার টিকে থাকা, বিকাশ ঘটা বা বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে অন্যতম জরুরী কারণগুলো হলো- ভাষার ব্যবহারকারীর সংখ্যা (ভাষার ক্রেতার সংখ্যা) ও বিশ্ববাজারে ওই ভাষা কতদূর প্রবেশ এবং আধিপত্য বিস্তার করতে পারছে। বাংলা ভাষার কোন বই কিংবা বাংলা ভাষায় কোন ডিজিটাল এপসের ক্রেতার হিসেবে বাংলা ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা সম্ভাবনাময়। ফলে বাংলার বিকাশ বা টিকে থাকার বাস্তবতা রয়েছে।
নিওলিবারেল ব্যবস্থা একদিকে জাতীয় বাজারের সীমানা তুলে ফেলে তাকে বিশ্ববাজারের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছে, অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়া সহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফর্ম সমস্ত দুনিয়ার ক্রেতাকে নির্দিষ্ট স্থানে কেন্দ্রীভূত করে করে ফেলছে। ফলে এই কেন্দ্রীভূত বাজারে দেশ-জাতি ভেদে ভাষা-সংস্কৃতি সব একীভূত হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় একটা নির্দিষ্ট ভাষায় বিদেশি শব্দের মিশ্রণ বা প্রভাব শুধু আবেগ কিংবা চোখ রাঙিয়ে ঠেকানো কঠিন এবং অর্থহীন।
একটা ভিনদেশি পণ্য আমদানি করা হলে ঐ পণ্যের সাথে ভাষাটাও আমদানি হয়। যেমন, পাউরুটি, আনারস, কপি, তামাক, পেয়ারা, চা, চিনি, কাগজ-কলম এসব পণ্য বিদেশি শব্দের হলেও এখন সেগুলো একীভুত হয়ে বাংলা ভাষার সম্পদে পরিণত হয়েছে। একইভাবে, এদেশের আইন-আদালত, প্রশাসন-দাপ্তরিক সংক্রান্ত বেশিরভাগ শব্দই আরবি, ফার্সি কিংবা ইংরেজি। এর কারণ উপনিবেশ হিসেবে এখানকার প্রতিষ্ঠানসমূহ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন দেশের অধীনে ছিল, ফলে নিজস্ব ভূমি থেকে এসব শব্দের উৎপত্তি না হলেও সেগুলো এখন বাংলা ভাষারই সম্পদ। একই প্রক্রিয়ায় আজকের সময়েও অনেক বিদেশি শব্দ তার পণ্য, সেবা বা বিনোদন খাতের মাধ্যমে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হচ্ছে। এরপরেও এসব বিদেশি শব্দকে বাংলা শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপিত সম্ভব যদি না পাল্টা কোন বিকল্প জনসাধারণের সামনে হাজির করানো যায় এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন ওই বিকল্প দিয়েই মেটানো যায়। যেমন, ‘মোবাইল ফোন’ বা ‘হ্যান্ড-সেট’ শব্দগুলোর বিকল্প হিসেবে ‘মুঠোফোন’ (মিশ্রশব্দ), ‘দূরালাপনী’ এসব শব্দ জনসাধারণের মাঝে চালু করা সম্ভব তখনি যখন এসব পণ্য উৎপাদনের নিজস্ব শিল্পের অস্তিত্ব এখানে থাকবে, অথবা উক্ত শব্দসমূহ সাহিত্য বা বিনোদনমাধ্যমে প্রচুর ব্যবহার করা হবে, কিন্ত তার জন্যেও দরকার শক্তিশালী প্রকাশনা শিল্প এবং বিনোদন শিল্পের অস্তিত্ব।
প্রমিত বাংলার ব্যবহারে বিভিন্ন শব্দগত ও উচ্চারণগত পরিবর্তন কিংবা আমদানি করা শব্দ নিয়ে এতই উদ্বিগ্নতা দেখা গিয়েছিল যে উচ্চ আদালতেও বাংলার বিকৃত বন্ধে (বেতার ও টিভি নাটকে) রুল জারি হয়েছিল। অন্যদিকে এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়ে এদেশের একটা নিজস্ব মানভাষা হিসেবে চালু করার প্রস্তাবও এসেছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী মানভাষা একাধিক থাকাটা যদিও সমস্যাজনক নয়।
প্রসঙ্গক্রমে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক, বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো সবসময় পণ্যের বিজ্ঞাপনে প্রমিত বাংলাই ব্যবহার করত। কিন্ত পরবর্তীতে ভোক্তাদের (বিশেষত তরুণ) সাথে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনের জন্য অপ্রমিত বাংলা ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিল। ২০০৫ সালে মুঠোফোন কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপনে প্রথম অপ্রমিত বাংলার ব্যবহার দেখা যায়। ঢাকার উচ্চ এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর তরুণদের গোষ্ঠীর মধ্যে কিছু শব্দ বিভিন্ন ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে চালু হয়েছিল। যেমন, আজাইরা, জাক্কাস, জটিল, জোশ, মাইনকা চিপা ইত্যাদি। গ্রামীণফোনের ডিজুস (d’juice) সিমের বিজ্ঞাপনগুলো ঢাকার এলিটশ্রেণীর এই তরুণদের ভাষাকে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়, যা অন্যান্য শ্রেণীর তরুণরাও লুফে নেয়। বিভিন্ন মাধ্যমে এসব শব্দের ব্যবহারের মাত্রা বেড়ে যাওয়াতে অনেকের মাঝে নেতিবাচক প্রক্রিয়া দেখা দেয় এবং বাংলা ভাষার বিকৃতির অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু এসব শব্দ ও উচ্চারণরীতির মাধ্যমেই যেহেতু ভোক্তাকে আকৃষ্ট করা সম্ভব হচ্ছিল, তাই ব্যবসা ও মুনাফার প্রয়োজনেই তা ব্যবহৃত হতে থাকে। লক্ষণীয়, এসব শব্দের অনেকগুলোই এখন তরুণদের নিত্যদিনের কথায় ব্যবহৃত হয় না, নতুন ভাবপ্রকাশক অনেক শব্দই এখন চলে এসেছে, পুরাতন অনেক শব্দই হারিয়ে গেছে।
এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষদের মুখের ভাষার সংমিশ্রণের ফলে প্রমিত বাংলায় যে শব্দ ও উচ্চারণগত পরিবর্তন আসছে, সেই পরিবর্তনগুলো স্থায়ী না। এক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন পড়ছে, এই ধরনের শব্দের ব্যবহার বা উচ্চারণরীতির ফলে ভাষার মৌলিক ব্যাকরণ কাঠামোর কোন পরিবর্তন হচ্ছে না, ফলে একে ভাষার বিকৃতি বা পরিবর্তন বলা সমীচীন না। দেখা যাচ্ছে, এসব শব্দগত পরিবর্তন চিরস্থায়ী না, নতুন বা পুরানো শব্দ আসছে কিংবা যাচ্ছে- ভাষার কাঠামো বা কঙ্কালে মেদ যুক্ত বা ঝরে যাওয়ার মত। এসব অস্থায়ী পরিবর্তিত শব্দভাণ্ডার ও উচ্চারণরীতির উপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব মানভাষা চালু করার প্রস্তাবটার বাস্তবতাও তাই এখন নেই। এই বিষয়ে হুমায়ূন আজাদের বক্তব্য প্রাসঙ্গিক- “বাঙলা ভাষার দু অঞ্চলে মান বাঙলা ভাষার অর্থাৎ চলতি বাঙলার রৌপ কাঠামো (ক্রিয়ারূপ, সর্বনামরূপ ও বহুবচনরাশি) হবে অভিন্ন, তবে তা নমনীয় ও সুস্থিতিশীল হবে … তাই দরকার দু-অঞ্চলের একটি যৌথ সংস্থা, যা বাঙলা ভাষার ক্রিয়ারূপ, সর্বনামরূপ ও বহুবচনরূপরাশি স্থির করে দিবে এবং মান বাঙলার ভাষার রৌপ কাঠামো করবে সুস্থিত।” হুমায়ুন আজাদের মতে, “উচ্চারণের ভিন্নতা, অর্থগত ভিন্নতা, এমনকি বাক্যিক কাঠামোতেও ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক, এবং এসব গৌণ ব্যাপার। মুখ্য হলো মান বাঙলা ভাষার রৌপ কাঠামো। তার অভিন্নতাই নির্দেশ করবে মান বাঙলা ভাষা একটি, যদিও তার শোভাসৌন্দর্য বিচিত্র।” কারণ রৌপ কাঠামোর ভিন্নতা মানে খোদ বাঙলা ভাষারই রূপান্তর।
৪
বাজারের বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার সংমিশ্রণে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক ভাষা, বাংলাদেশে অনেক ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষাই আজ বিপন্নতার মুখে। বাজারে নিজের ভাষাকে পণ্যায়িত করতে না পারা, ভাষার অর্থনৈতিক উপযোগ সৃষ্টি করতে না পারার কারণে, আধিপত্যবিস্তারকারী ভাষাগুলোর সামনে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না এসব ভাষা।
ভাষার বিস্তারের সাথে পুঁজি এবং ক্ষমতার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যেমন, বৃটিশ ভারতে ভারতীয় বুর্জোয়ারা নিজেদের পুঁজির বিস্তারের স্বার্থে এককেন্দ্রিক শাসনের পাশাপাশি এক ভাষা ও একজাতির আওয়াজ তুলেছিল (আজকের বিজেপি এর সাথে যুক্ত করেছে এক করের দাবি)। গান্ধী প্রকাশ্যে বলতেন, অহিন্দিভাষীদের হিন্দি শেখা হচ্ছে ধর্ম। ১৯২০ সালে সিন্ধু ন্যাশনাল কলেজে তিনি বলেছিলেন “হিন্দিই হবে সমগ্র ভারতের ভাষা।” ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের এক অধিবেশনে জিন্নাহ ভারতের জাতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেন। ১৯৪৮-এ এসে জিন্নাহ বললেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষীরা রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাকে নিজেদের রাষ্ট্রভাষা করতে সমর্থ হয়, দেশ স্বাধীনের পরে সেই বাংলা ভাষা এবং বাংলাভাষীর পুঁজি পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীদের ওপর জাতিগত ও ভাষাগত আগ্রাসন চালাতে লাগল। ইতিহাসের এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায় পুঁজির বিস্তার ও আধিপত্য ধরে রাখার জন্য ভাষা কিভাবে আগ্রাসনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিজ জাতির ভাষাকে ভিন্নভাষীর দেশে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ভাষার ক্রেতার সংখ্যা বাড়ে, পুঁজির বিস্তারেও তা সহায়ক। বৃটিশ উপনিবেশ থেকে শুরু করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যুগে যুগে সারা বিশ্বে ক্ষমতা ও পুঁজির আগ্রাসনের মাধ্যমে ইংরেজিকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে, বিশ্ববাজারে টিকে থাকার জন্য তা একটা অপরিহার্য ভাষাতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে টিকে থাকার জন্য বাংলা ভাষার প্রয়োজন রয়েছে, পাশাপাশি ইংরেজিরও। বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী পার্বত্য অঞ্চলে বাংলা ভাষী সেটেলার সহ হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ কাঠামো, পর্যটন-বাণিজ্য কাঠামোর মাধ্যমে বাংলা ভাষীদের পুঁজি ও প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে যে বাজার তৈরি করেছে, পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীদের বাধ্য হয়ে সেই বাজারের অংশ হতে হয়েছে। বাজারে বাংলা ভাষার আধিপত্যের মুখে পড়ে এবং সে ভাষার বিপরীতে নিজেদের ভাষার কোন অর্থনৈতিক উপযোগ তৈরি করতে না পারার কারণে অনেক জাতিগোষ্ঠীর ভাষাই আজ বিপন্নতার মুখে। পুঁজিবাদের বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে বিভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটলেও, আধিপত্যকারী পুঁজি ও ভাষার কাছে বাজারে প্রবেশ করতে না পারা ভাষাগুলো বিলুপ্তির মুখে পড়ে যাচ্ছে। সমাজতান্ত্রিক কাঠামোতেও এই সংমিশ্রণ ঘটবে, কিন্তু তা মুনাফাকেন্দ্রিক এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ না হয়ে সহাবস্থানমূলক হবে, ফলে প্রত্যেক ভাষারই একটা স্বায়ত্তশাসন থাকবে, এতে পিছিয়ে পড়া ভাষাগুলো বিলুপ্ত হবে না, তবে অন্যান্য ভাষার স্রোতের সাথে মিশে কালক্রমে নতুন কোন ভাষার রূপ ধারণ করবে।
নিওলিবারেলের এই ডিজিটাল যুগে কোন ভাষার পক্ষেই বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে অবিকৃত হিসেবে টিকে থাকা মুশকিল। বাংলা ভাষা তার বিশাল ব্যবহারকারী নিয়ে বিশ্ববাজারে যুক্ত হয়েছে, কিন্তু সে ভাষা দিয়ে আশানুরূপ কোন কার্যক্রম করে উঠতে পারছে না। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে- বাংলা ভাষার যে ব্যাকরণ কাঠামো, অভিধান ও মান ভাষা, তা অনেকটা সংস্কৃত নির্ভর হয়ে গড়ে উঠেছিল। ভাষার কাঠামো বা ব্যাকরণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্মাণ করা বা অন্য ভাষা থেকে চাপিয়ে এনে দেওয়ার বিষয় না (যেটা বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে হয়েছিল), বরং এটা আবিষ্কার করার বিষয়। দক্ষিণ এশিয়ার সমগ্র বাংলাভাষী অঞ্চলের মুখের ভাষার উপর ভিত্তি করে বাংলা ভাষার কাঠামো আবিষ্কার করা এবং তা বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক ভাষা চর্চার উপযোগী করে উপস্থাপন করাটাই ব্যাকরণবিদদের কাজ। বাংলা অভিধান ও মান ভাষাকে আরো উদার ও সময়োপযোগী করা প্রয়োজন। একই সাথে নিজস্ব শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সাথে ভাষার সমৃদ্ধি ও বিকাশও জড়িত। বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প পণ্য, নিজস্ব ভাষার সাংস্কৃতিক পণ্য উৎপাদনের কোন প্রতিষ্ঠিত শিল্পক্ষেত্র নেই, যার কারণে সাহিত্য-চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ভাষার বিস্তার ঘটছে না, জটিল ও অসম্ভব হয়ে উঠেছে জ্ঞান-অনুবাদ চর্চাও। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন না করে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন ও উচ্চ শিক্ষায় বাংলার ব্যবহারের দাবিগুলোও হবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সামিল।
(অজিত রায়, প্রাবন্ধিক)


















