পৈত্রিক বাড়ি পূর্ববঙ্গের কোটালীপাড়া হলেও ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় জন্ম নেয় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য নবযুগের কবি, সাম্যবাদের কবি, বিপ্লবের কবি, নামে খ্যাত। যে নামেই আখ্যায়িত করা হোক সর্বোপরি তিনি ছিলেন শ্রেণী সংগ্রামের কবি – তথা বাংলা ভাষায় শ্রমিক শ্রেণীর প্রথম স্বার্থক কবি। ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতায় কবি নিজেকে দুর্ভিক্ষের কবি হিসেবে দাবী করেন।
উনিশ শতকের গোড়া থেকে বৃটিশ উপনিবেশের অবসানের আগ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য ও বাঙালী সমাজের বিকাশের এক নতুন ধারা সংযোজিত হয় তা বুঝতে গেলে তৎকালীন বাংলাদেশের ইতিহাস ও এই ক্ষনের চরিত্র ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে।
’উনিশ শতকের শেষে বৃটিশ শাসক বাংলাদেশের বিস্তীর্ন গ্রামাঞ্চলে নিজেদের শাসন ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করার উদ্দ্যেশে এবং ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রকে নবজীবন দিতে চিরস্থায়ী ভুমি রাজস্ব ব্যবস্থা জারি করে। ফলে উনিশ ও বিশ শতকে বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পুষ্ট জমিদার শ্রেণী এবং চাকুরী ও ব্যবসায়ীজীবীর মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি চর্চার এক বিশেষ অঙ্গ। কাজেই এইসব শ্রেণী চরিত্রের বৈশিষ্টকে বাদ দিয়ে তৎকালীন বাংলা কাব্য-সাহিত্যের বিচার সম্ভব নয়।১
তাই বাংলাদেশের চাকুরী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সাহিত্যিক, কবিরা স্বভাবতই সামন্তীয় চেতনা, ধর্মাচ্ছন্ন ও পরগাছা সুলভ চরিত্র বিশিষ্ট। এইদিক দিয়ে ইউরোপীয় বুর্জোয়া মধ্যবিত্তের শিল্প বানিজ্যে নির্ভর থাকায় তাদের মধ্যবিত্তের সাহিত্যচর্চা ছিলো ধর্মযুক্ত ও স্বাধীন চিন্তায় বিকাশমুখী। তাই উদারনৈতিক ও মানবতাবাদী সাহিত্য চিন্তক “ঈশ্বরচন্দ্র, অক্ষয় দত্ত, মধুসূদন ও রবীন্দ্রনাথকে মোটামুটি বাদ দিয়ে উনিশ শতকের বাংলা কাব্যসাহিত্যের ক্ষেত্রে একথা ঢালাও ভাবে বলা চলে।”২
এটা সত্য যে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায় ধর্মাচ্ছন্ন থাকলেও তারা ধর্ম বিদ্বেষী ও সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। পরবর্তীতে চাকুরি ও ব্যবসা ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধার জন্য ও ঈশ্বরচন্দ্রের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সাম্প্রদায়িকতা ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে এবং কিছু কিছু সাহিত্য ক্ষেত্রেও তা দেখা যায়।
“বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে বুর্জোয়া কবিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ছিলেন সর্বপ্রধান অসাম্প্রদায়িক কবি। রবীন্দ্রনাথ বিশেষ অর্থে ধার্মিক হলেও তার মধ্যে ইউরোপীয়, বুর্জোয়া উদারনৈতিকতার প্রভাব এতো প্রবল ছিল যে সংকীর্ণ ধর্মান্ধতা অথবা সাম্প্রদায়ীকতার চিন্তা ভাবনা কাব্যচর্চাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি।” ৩ নজরুল ইসলাম ছিলেন পুরোপুরি বাঙালী কবি। তার কবিতায় বাঙালী জাতীয়তাবাদকে তিনি ধারন করেছিলেন।
১৯৩০-৪০ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ক্ষতচিহ্নের প্রভাব যখন বাংলাদেশে দেখা দেয় এবং এরই পরে তেতাল্লিশের মন্বান্তরে বেঁচে থাকা থাকার লড়াইয়ে এক যুগ সন্ধিক্ষণে সুকান্তের চৈতনায় আঘাত হানে শ্রেণী সংগ্রামের আকাঙ্ক্ষা ও তার তীব্রতা।
সুকান্ত কাব্যচর্চা শুরু করেন ১৯৪০ সালে তার চৌদ্দ বছর কিশোর বয়সে। সারাদেশে কংগ্রেস ও লীগের রাজনীতি ক্ষেত্রে আধিপত্য সত্বেও তখন এক্ষেত্রে শ্রমিক ও কৃষকের সংগ্রামী সত্বার প্রকাশ ঘটতে শুরু করে। ‘ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষক সভার মাধ্যমে তারা ব্যাপকভাবে শুরু করে নিজেদের কে সংগঠিত করার কাজে। তাদের মধ্যে দেখা দেয় এক নতুন জীবন চেতনা…….’ ৪
সুকান্তের পূর্বাভাস কবিতায় এই নব চেতনার কথা উঠে আসে।
হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ
কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছাসে,
সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ।
জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে।
হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন
জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান,
গত আকালের মৃত্যুকে মুছে
আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ। (দুর্মর)
পরিশেষে রক্তপথের সংগ্রামের পথকে মুক্তির পথ হিসাবে চিহ্নিত করেন
“হয় ধান নয় প্রাণ” এ শব্দে
সারাদেশ দিশাহারা,
একবার মরে ভুলে গেছে আজ
মৃত্যুর ভয় তারা।
সুকান্ত কিশোর বয়সেই রাজনৈতিক সংগ্রামী চেতনার পরিপক্কতা লাভ করতে শুরু করে। যা কবিতায় ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার প্রকাশ পায়। তবে সে সময়ে অনেক কবি সাহিত্যিক তার এই পরিণত পরিপক্কতাকে কিশোর কবি বলে অবমূল্যায়ন করতে সচেষ্ট হয়েছেন। সুকান্ত সম্পর্কে খ্যাতিমান কবি বুদ্ধদেব বসু লিখেন,
‘যুগের কাছে ব্যক্তির সর্বস্ব সমর্পনের সমীকরণে তার কবিত্বের কুঁড়ি ধরেই ঝরে গেল। কবি হওয়ার জন্যই জন্মেছিলেন সুকান্ত। কবি হতে পারার আগেই তার মৃত্যু হল:’ (কবিতা আষাঢ় ১৩৫৪)
সুকান্ত রাজনৈতিক কবিতা লিখে শক্তির অপচয় করেছে। তাই দুঃখ হয়। অগ্রজ ও বন্ধুস্থানীয় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় সুকান্তের একুশ বছরের বিষয়টি টেনে এনে খেদোক্তি করেছেন, ….. এবং অবিশ্বাস্য হলেও বস্তুতপক্ষে তিনি পাঠকের কাছে অল্প বয়সের দোহাই পেড়ে তার কবিতাকে চৌদ্দ বছরের কিশোর কবির কবিতা বলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করেন। আবার সুকান্ত বিয়োগের পর আক্ষেপ করে- সুকান্তের কবিতার পরিমানের চেয়েও তাতে প্রতিশ্রুতির কথাও বলেন।
‘আমি কবিতা রেখে পার্টিতে আসলাম আর সুকান্ত এসেছিলো কবিতা নিয়ে।’
বাংলাদেশের বিদ্বৎ সমাজে এমন সাধারন ধারণাও আছে যে কবি নজরুল কিম্বা সুকান্ত যদি সুস্থ স্বাভাবিকভাবে দীর্ঘায়ু হতেন তবে তারা রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বিশ্বকবি হতেন। মুলত আসলে এসবই শিশু সুলভ কথা বই কিছু নয়। একজন সৃষ্টিশীল মানুষকে বিচার করা উচিৎ বয়সের দোহাই না পেরে তার সময়ের কর্মসাধনার ওপর।
অন্যদিকে কথা সাহিত্যিক তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়ের মূল্যায়ন এমন ছিলো, ‘সাধারণ মানুষের প্রানের গ্লানি সহজ মর্যাদায় প্রথম বাঙময় হয়ে উঠেছে সুকান্তের কাব্যে। সাধারণ মানুষের জীবনকে সম বেদনায় অন্তর দৃষ্টিতে লেখবার যে শক্তি সুকান্ত লাইব্রেরি সরস্বতীর কাছে পায়নি- যার অধিষ্ঠান মাঠে গ্রামে বস্তিতে, কারখানায় রাজপথে।
সুকান্তের কাব্য সম্বন্ধে দেশ হিতৈশি দৈনিকে সুব্রত চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, শোষকের নন্দনতত্ত্ব তথা বিপ্লবী নন্দনতত্ত্ব কখনো এক হতে পারেনা।
১৯৪০ সালে ক্রমাগত শিল্প শ্রমিক ধর্মঘট, কৃষক বিক্ষোভ আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন সুকান্তকে আলোড়িত করে এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী চেতনায় শানিত করে। সুকান্ত এর আগে বিপ্লবী ধারায় গঠিত ১৯৩৬ এর বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠা সম্মেলনে যোগদান করেন।
১৯৩৮ এ – ছাত্র ফেডারেশনের বিনা বিচারে আটক রাজবন্দীদের মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করেন।
১৯৪০-৪১ এ – সুকান্ত ও অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে কিশোর বাহিনী গঠিত হয় এবং সাংস্কৃতিক বৃগেট গঠন করেন যার ধরাবাহিকতায় IPTA গঠিত হয়।
১৯৪১- এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করলে Aid to The Soviet কমিটিতে ছিলেন সুকান্ত। এই বয়সেই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হোন।
১৯৪২-৪৩ এ সলিল চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথ, বিনয় রায় ও সুকান্ত ইংরেজ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুরধার কবিতা লিখেন। আর সুকান্তের অভিযান নাটক বাংলার বিভিন্ন প্রান্তরে অভিনীত হয়।
‘সুকান্তের মধ্যে শ্রেণী চেতনা ও শ্রেণী সংগ্রামের ক্ষেত্রে কোন অস্পষ্ঠতা অথবা গড়িমসি নেই। জনতার সংগ্রাম তার অনিবার্যতার পরিণতির দিকে এগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে সুকান্ত যেমন ছিলেন রাজনৈতিক জীবনে, তেমনি কাব্য চর্চা ক্ষেত্রে অনমনীয়। ৫
চল্লিশ দশকে ব্যাপক আন্দোলনের যে তুফান ঘনিয়ে উঠেছিল তা তিনি চিত্রিত করেন,
‘বেজে উঠলো কি সময়ে ঘড়ি?
এসো তবে আজ বিদ্রোহ করি,
আমরা সবাই যে যার প্রহরী
উঠুক ডাক।
তারপর,
মানবো না বাধা, মানবো না ক্ষতি,
চোখে যুদ্ধের দৃঢ় সম্মতি
রুখবে কে আর এ অগ্রগতি,
সাধ্য কার?
সমাজে শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ও অনিবার্য দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে যে বিশ্বশান্তি মিলবে না তাতে সুকান্তের ছিল দৃঢ় আস্থা ও প্রতিজ্ঞা।
‘হাজার লেনিন যুদ্ধ করে,
মুক্তির সীমান্ত ঘিরে বিস্তীর্ন প্রান্তরে।
বিদ্যুৎ ইশারা চোখে, আজকেও অযুত লেনিন (ছাড়পত্র লেনিন)
সুকান্ত ছাড়পত্র, ঘুম নেই ও পূর্বাভাস নামক ৩টি কাব্যগ্রন্থ, চিঠিপত্র ও ছোট গল্প রয়েছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ছাড়পত্রে- ছাড়পত্র কবিতায় সে আগামী নবজাতকের কাছে- বাস যোগ্য পৃথিবী গঠনের অঙ্গীকার করে লিখেন,
চ’লে যাবে—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবাে জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযােগ্য করে যাবাে আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
দুর্ভিক্ষের কষাঘাতে শ্রেণী বৈষম্য ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনায় লিখলেন প্রতীকী কবিতা একটি মোরগের আত্মকাহিনী-
তারপর সত্যিই সে একদিন প্রাসাদে ঢুকতে পেলো,
একেবারে সােজা চ’লে এলাে
ধপধপে সাদা দামী কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে,
অবশ্য খাবার খেতে নয়—
খাবার হিসেবে॥
বিপ্লবী রুপক কবিতা- সিঁড়ি, দেশলাইয়ের কাঠি, আগ্নেয়গিরি, সিগারেট ইত্যাদি। মুক্ত স্বদেশে দেখা করার আহবান জানিয়ে ঠিকানা, সমাজ বিজ্ঞানের চোখে শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা, সততা, ভয়, উৎকন্ঠা মিশ্রিত অল্পদামে কেনা জীবন নিয়ে রানার কবিতা লিখেন-
হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো,
শেষে
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়ঃ
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্সানাে রুটি॥
৪৩ এর মন্বন্তরে রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে লিখেন, রবীন্দ্রনাথের প্রতি –
তাই আজ আমারাে বিশ্বাস,
“শান্তির ললিত বাণী শােনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।”
২৫শে বৈশাখ কবিতায়
এবারে নতুন রূপে দেখা দিক রবীন্দ্রঠাকুর
বিপ্লবের স্বপ্ন চোখে, কণ্ঠে গণ-সংগীতের সুর;
১৯৪৬ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনে লিখেন, অনুভব
বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে,
আমি যাই তারি দিন-পঞ্জিকা লিখে,
এত বিদ্রোহ কখনো দেখে নি কেউ,
দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ;
স্বপ্ন-চূড়ার থেকে নেমে এসো সব—
পরিশেষে- সুকান্তের সাত বছরের কাব্যচর্চায় – চারিদিকে যা কিছু ঘটে যেত সবই তার কলমে উঠে আসতো আশ্চর্য শক্তিতে। তার এই সমাজ চেতনা অদ্যাবধি বাংলা কবিতায় অনতিক্রান্ত।
বাংলা কবিতার ইতিহাসে তাই কবি সুকান্তের স্থান শ্রমিক শ্রেণীর প্রথম স্বার্থক কবি হিসাবে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত।
১-৬: বদরুদ্দীন উমর, ভূমিকা, সুকান্ত সমগ্র, মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশনী।


















