Homeমতামতবাংলাদেশের জনগণের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় কনভেনশন

বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় কনভেনশন

-

লুটেরা-সন্ত্রাসী শাসক শ্রেণীর হাত থেকে দেশ রক্ষায় এগিয়ে আসুন

বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় কনভেনশন

২৪শে অক্টোবর, শুক্রবার, সকাল ১০টা, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, ঢাকা

আহ্বায়ক: বদরুদ্দীন উমর

বাংলাদেশের জনগণের জীবন এখন লুন্ঠনজীবী সন্ত্রাসীদের শাসনে নিদারুনভাবে সংকটাপন্ন। তাঁদের জীবনে কোন নিরাপত্তা নেই; বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি তাঁদের অর্থনৈতিক জীবনকে বিপর্যস্ত করছে। এই দুর্বিষহ জীবন পরিবর্তনের জন্য জনগণের মধ্যে চারিদিকে এক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। জনগণ এই পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন।

জনগণের মধ্যে এই অস্থিরতা বাস্তবতঃ এমন এক পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হয়েছে যখন বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীরাও এক অচলাবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই অচলাবস্থার অর্থ এই নয় যে, এরা কোন প্রকারে নিজেদের শাসন চালিয়ে যেতে এই মুহূর্তে অক্ষম। এরা শাসন চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে যে অচলাবস্থার কথা বলা হচ্ছে তার অর্থ এদের শ্রেণীগত অবস্থান টিকে থাকার আর কোনই সম্ভাবনা নেই, এরা খুব দ্রুত ভেঙে পড়ছে।

এই ভাঙন এদের অর্থনীতির মধ্যে, প্রশাসন, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও আইন ব্যবস্থার মধ্যে, এবং সর্বোপরি এদের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে খুব স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ও প্রতিফলিত হচ্ছে। এই ভাঙন সমগ্র সমাজে যে বিশৃংখলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে তার পরিণতিতে জনগণের জীবন আজ দুঃখকষ্টে জর্জরিত, দুঃসহভাবে বিপর্যস্ত ও মারাত্মকভাবে বিপন্ন।

এই শাসক শ্রেণীর গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যেই ভাঙন সৃষ্টির মূল কারণ নিহিত আছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শোষণ অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও মূলতঃ শোষণের পরিবর্তে দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের মাধ্যমে এই শ্রেণীটি গঠিত হয়ে এসেছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এরা শোষণজীবী প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে বিকশিত হওয়ার পরিবর্তে দ্রুত পরিণত হয়েছে লুন্ঠনজীবী সন্ত্রাসীতে। এই লুন্ঠনজীবী সন্ত্রাসী বা লুমপেন বুর্জোয়াদের শাসনই আজ আমরা খুব স্পষ্টভাবে আমাদের চোখের সামনে দেখছি।

পুঁজিবাদী বড়লোক বা বুর্জোয়ারা হলো মূলতঃ শোষণজীবী প্রতিক্রিয়াশীল। শ্রমিকের শ্রমশক্তি যা উৎপাদন করে তার থেকে উদ্বৃত্ত শোষণ করেই তারা নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। এই শোষণের প্রয়োজনেই তারা এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে গড়ে তোলে নিজেদের শাসন ও নির্যাতন ব্যবস্থা, তাদের শাসন কায়দা। কিন্তু যে শাসক শ্রেণীর সম্পদ গড়ার মূল প্রক্রিয়া উৎপাদনের উদ্বৃত্ত অপহরণের পরিবর্তে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিদ্যমান সম্পদের লুন্ঠন, তাদের শাসন কায়দা এবং শোষণজীবী বুর্জোয়াদের শাসন কায়দার ধরন এক হতে পারে না। এই শেষোক্তদের শাসনে শোষণ নির্যাতন থাকলেও কতকগুলি সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও আইন কানুনের মাধ্যমেই সাধারণভাবে তাদের শাসন পরিচালিত হয়। কিন্তু দুর্নীতি ও সন্ত্রাস কোন সুনির্দিষ্ট নিয়ম কানুনের অধীন নয়, উপরন্তু আইন কানুনের বিদ্যমান কাঠামো ধ্বংস করেই তা অব্যাহত থাকে।

আজকের বাংলাদেশে আইন শৃংখলা পরিস্থিতির উত্তোরত্তর অবনতি ঘটতে থাকা অবস্থায় সারা দেশে যে নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তার মূল কারণ এই শাসক শ্রেণীর পক্ষে পুরাতন কায়দায় শাসন পরিচালনা আর সম্ভব হচ্ছে না এবং শাসনের কোন নোতুন কার্যকর কায়দা অবলম্বনও এদের পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই এই শাসক শ্রেণীর যে কোন ক্ষমতাসীন সরকারের নানা প্রকার ব্যর্থতা শুধু সেই বিশেষ সরকারেরই ব্যর্থতা নয়। সাধারণভাবে এই লুন্ঠনজীবী শাসক শ্রেণী যে শাসন সংকটের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে তার প্রতিফলনই ঘটছে বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারের ব্যর্থতার মধ্যে। এই ব্যর্থতা একের পর এক সরকারের আমলে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে জনগণের সাথে শুধু ক্ষমতাসীন সরকারেরই নয়, সমগ্র শাসক শ্রেণীর দূরত্বই যে শুধু বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই নয়, বিচ্ছিন্নতা ব্যাপক ও গভীর হচ্ছে। যে কোন ব্যবস্থাতেই এই বিচ্ছিন্নতা শাসক শ্রেণীর পরমায়ু বৃদ্ধি করে না। উপরন্ত তাঁদের পরিপূর্ণ উচ্ছেদের শর্তই তৈরী করে।

এই উচ্ছেদের সম্মুখীনই আজ বাংলাদেশের সমগ্র শাসক শ্রেণী। এরা এখন অন্তর্নিহিতভাবে এতই দুর্বল যে, এদেরকে রক্ষা করার মত কোন শক্তি এদের শাসন কাঠামোর মধ্যে নেই। আভ্যন্তরীণ শক্তির এই অনুপস্থিতি এদেরকে উত্তোরত্তরভাবে বিদেশী শক্তি অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদের, বিশেষতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ওপর নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য করছে। প্রকৃতপক্ষে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাহায্য সহযোগিতা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর টিকে থাকার সর্বপ্রধান শর্ত।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কথিত নোতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ সম্প্রসারিত করার প্রয়োজনে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী শিল্প ধ্বংসের কাজ বেশ দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করছে। শিল্প কারখানা আরও ব্যাপকভাবে যেখানে গড়ে তোলা দরকার সেখানে আদমজীর মত বিশাল পাট কল থেকে নিয়ে একের পর এক পাট কল, বস্ত্র কল, কাগজ কল, চিনি কল সব কিছুই লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে বন্ধ করা হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে বেকার এবং কারখানাগুলির যন্ত্রপাতি ধ্বংস করা হচ্ছে। এ বছর নোতুন শিল্প ধ্বংস কর্মসূচী অনুযায়ী ১০৫টি শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হবে। এর পর শুরু হবে এগুলির সম্পত্তি লুটপাট।

শিল্প প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বাংলাদেশের ব্যাংকগুলি এখন লুষ্ঠনকারীদের একটি লক্ষ্যবস্তু (target)। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাফিরা এগুলিকে এমন অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে যাতে এখানকার অর্থ-ব্যবস্থা এখন এক বড়ো রকমের সংকটের সম্মুখীন। হাজার হাজার ব্যাংক কর্মচারী ছাঁটাই এর হুমকীর মুখে।

বাংলাদেশ রেলওয়েকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে এসে ব্যাপক লুটপাট ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। রেলের জমি দখল হচ্ছে, মাইলেজ কমানো হচ্ছে, মেরামত কারখানা বন্ধ করা হচ্ছে, এবং শীঘ্রই রেলওয়েকে একটি কর্পোরেশনে পরিণত করে মার্কিন, ভারতীয়, জাপানীসহ বিদেশী ও সাম্রাজ্যবাদী মটর শিল্পের স্বার্থে রেলকে দ্রুত ধ্বংসের চক্রান্ত কার্যকর করা হচ্ছে। এই সাথে চক্রান্ত হচ্ছে মার্কিন কোম্পানীগুলির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ভারতে গ্যাস রপ্তানী করে বাংলাদেশের সব থেকে মূল্যবান জ্বালানী সম্পদ দ্রুত নিঃশেষ করার। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাসের মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধি করে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক জীবনকে ইতিমধ্যেই আরও বেশী বিপর্যস্ত করা হয়েছে।

বর্তমান শাসক শ্রেণীর অধীনে ভূমি ব্যবস্থা আমূল সংস্কারের কোন সম্ভাবনা নেই, অথচ এই ভূমি ব্যবস্থার থেকে উদ্ভুত হাজারো সমস্যা শুধু যে কৃষক, গ্রামীণ মজুরসহ গ্রামাঞ্চলের গরীবদের জন্য কাজের অভাব সৃষ্টি করছে তাই নয়, কৃষি ও শিল্পের বিকাশকেও সামগ্রিকভাবে ব্যাহত করছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (BADC) মত প্রয়োজনীয় সংগঠনের আকার ক্রমশঃ ছোট করে ও এর কার্যকারিতা হ্রাস করে কৃষিক্ষেত্রে বিশৃংখলা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ সমস্তই হচ্ছে বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবির মত সাম্রাজ্যবাদী অর্থ সংস্থার সরাসরি নির্দেশে।

বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে যা সব থেকে লক্ষ্যণীয় তা হলো শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে অসাধু ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত দুর্নীতিবাজ আমলা ও সেনাবাহিনীর অফিসার, সন্ত্রাসী ইত্যাদি অরাজনৈতিক লোকদের বিপুল প্রাধান্য এবং রাজনৈতিক দলগুলির সব ধরনের ও সর্ব স্তরের নেতানেত্রীর অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি এবং লুণ্ঠন।

বাংলাদেশের মত একটি দেশে, যেখানে লুন্ঠনজীবী সন্ত্রাসীদের রাজত্ব কায়েম হয়েছে, সকল প্রকার সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা যে সাধারণভাবে বিপন্ন থাকবে এটা স্বাভাবিক। এ কারণে ধর্মীয়, জাতিগত, ভাষাগত সংখ্যালঘুদের ওপর নানা প্রকার নির্যাতন এখানে জারী আছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম থেকেই আওয়ামী লীগ পাকিস্তানী আমলের ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ রদ না করে তার নাম পরিবর্তন করে ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’ রেখে হিন্দুদের সম্পত্তি অবাধে ও ব্যাপকভাবে লুটপাট করে। লুটপাট ও নির্যাতনের এই একই ধারায় ২০০১ সালের ১লা অক্টোবরের নির্বাচনের পরপরই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বৃদ্ধি পায়। তাদের অনেকের সম্পত্তির ওপর হামলা হয় এবং হামলাকারীদের হাতে কিছুসংখ্যক প্রাণ হারাণ। এসব সত্ত্বেও ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দুদের কোন প্রতিরোধ এর বিরুদ্ধে নেই। তাঁরা অনেকেই ভারতকে নিজেদের পরিত্রাতা ও আশ্রয়স্থল মনে করে এই হামলার মুখে দেশ ত্যাগ করেন। কেউ কেউ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের মত সাম্প্রদায়িক সংগঠনের খপ্পরে পড়ে লুন্ঠনজীবীদের রাজনীতিকেই মদদ যোগান। এর কারণ হলো, বাংলাদেশে এমন কোন সুসংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলন নেই যা ধর্মীয় সংখ্যালঘু সংখ্যাগুরু নির্বিশেষে সকলের বিরুদ্ধে নির্যাতন ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করতে পারে। লুষ্ঠনজীবী সন্ত্রাসীদের শাসনের বিরুদ্ধে এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই সংখ্যালঘু সংখ্যাগুরু হিসেবে বিভক্ত জনগণের জীবনকে সাধারণভাবে শোষণ নির্যাতন থেকে মুক্ত করতে পারে।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে যা সত্য সেটা জাতিগত ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রেও সত্য। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরং ইত্যাদি জাতিগত সংখ্যালঘু থেকে নিয়ে মুন্ডা, সাঁওতাল, গারো, খাসিয়া, মণিপুরী, রাখাইনসহ অন্যদের বিরুদ্ধে হামলা একটি নিয়মিত ব্যাপার। সংখ্যালঘুদেরকে তাঁদের নিজস্ব ভিটেবাড়ী ও জমি থেকে উৎখাত করা হচ্ছে। তাঁদের সাংস্কৃতিক জীবনও বিপন্ন। তাঁদের অনেকেই স্বদেশে বাস করছেন উদ্বাস্তুর মত।

ভাষার অধিকারের জন্য আন্দোলন এই অঞ্চলের বাংলাভাষীদের এক গৌরবময় ঐতিহ্য। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই উর্দুভাষীদের তাদের নিজস্ব ভাষা চর্চার অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা হয়েছে। তাঁদের জন্য কোন স্কুল নেই, রেডিও টেলিভিশনে কোন প্রোগ্রাম নেই, কোন প্রেস ও পত্রিকা নেই। ভাষার ওপর এই ফ্যাসিস্ট হামলা সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, গারো, মণিপুরী ইত্যাদি জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপরও জারী আছে।

সংখ্যালঘুদের ওপর এই হামলা নির্যাতন বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু জনগণের ওপর শোষণ নির্যাতনের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। এ কারণে জনগণের সাধারণ শত্রু, লুণ্ঠনজীবী সন্ত্রাসী শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সকল প্রকার সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ছাড়া মুক্তির দ্বিতীয় পথ নেই।

শিশু ও নারী নির্যাতন, যার সর্বোচ্চ রূপ শিশু হত্যা এবং নারী ধর্ষণ ও হত্যা, এখন বাংলাদেশে এক নিয়মিত ব্যাপার। সম্প্রতি শিশু হত্যাসহ অন্যান্য হত্যার কিছু মামলায় দ্রুত বিচার করে আদালতে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে, এই শাস্তি সম্ভাবনার মুখেও শিশু অপহরণ ও হত্যা, নারী হত্যার ঘটনা কমে আসার পরিবর্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজে সাধারণভাবে অপরাধীকীকরণ কি মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে এটা হলো তারই এক অভ্রান্ত মাপকাঠি।

বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা এখন দ্রুত ভেঙ্গে পড়ছে। অগণতান্ত্রিক, অবৈজ্ঞানিক, পশ্চাৎপদ ও দলীয়করণকৃত পাঠ্যতালিকা থেকে নিয়ে শিক্ষা প্রদান পদ্ধতি; বিল্ডিং, আসবাবপত্র, বইপত্র, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির অভাব ও অব্যবস্থা; ১৯৭২ সালে বাংলাকে রাতারাতি শিক্ষার মাধ্যম করে ইংরেজী শিক্ষা বন্ধ করা এবং বাংলা ভাষায় প্রয়োজনীয় বইপত্রের ব্যবস্থা না করা ইত্যাদি কারণে শিক্ষার মান দ্রুত নিম্নমুখী হয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার এখন ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া বেশ ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে। এই প্রতিক্রিয়ার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ছাত্র যুবকদের মধ্যে চরম হতাশা, এই হতাশার দ্বারা তাড়িত হয়ে নানাপ্রকার মাদকদ্রব্য, ছিনতাই, ধর্ষণ, খুনজখম, সন্ত্রাস ও লুটতরাজের মত অপকর্মে তাদের গা ভাসিয়ে দেওয়া। ছাত্র সমাজ ও যুবকদের প্রায় সমগ্র অংশ এখন স্বাভাবিক ও সুস্থ চিন্তা করতে অপারগ থাকার কারণে তাদের চিন্তা চেতনা ও সাংস্কৃতিক জীবন বলা চলে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। শাসক শ্রেণীর মূল রাজনৈতিক দলগুলি ছাত্রদের এই দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাদের অনেককে নিজেদের শ্রেণীগত ও দলীয় স্বার্থে ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করছে। এ দেশের ইতিহাসে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলনের গৌরবময় ঐতিহ্য এভাবেই ভুলুষ্ঠিত হচ্ছে।

পুলিশী ব্যবস্থার অপরাধীকীকরণ এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে পুলিশ এবং দুর্নীতিবাজ থেকে নিয়ে সন্ত্রাসী ক্রিমিনালরা মিত্র শক্তি হিসেবে হাত ধরাধরি করে ঢাকা থেকে নিয়ে সারা দেশে অপরাধমূলক তৎপরতা প্রায় অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে। এই দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদের একটা বড় অংশ শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের, বিশেষতঃ দুই প্রধান দলের, নেতা ও কর্মী।

রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থার এই দিক লক্ষ্য করে এদেশের জনগণ বর্তমান শাসক শ্রেণীর ওপর আস্থা হারিয়েছেন, তাদের থেকে আর কোন কিছু তাঁরা প্রত্যাশা করেন না। জনগণ এই অবস্থার পরিবর্তন চান। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, দেশের শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের আকাংখা জনগণের মধ্যে আজ এমন তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে যা ইতিপূর্বে কোনদিন দেখা যায় নি। পরিবর্তনের এই আকাংখাই বর্তমান বাংলাদেশের জনগণের চেতনার সব থেকে উল্লেখযোগ্য দিক।

কিন্তু পরিবর্তনের আকাংখা থাকলেও এর সম্ভাবনা সম্পর্কে জনগণ এখনো নিশ্চিত নন। এই পরিবর্তন কোন প্রক্রিয়ায় হবে এবং কোন্ রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্বে হবে তার কোন নির্দিষ্ট ধারণাও তাঁদের নেই। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশের জনগণ আজ দাঁড়িয়ে আছেন ইতিহাসের এক পরম সন্ধিক্ষণে।

বামপন্থী ও কমিউনিস্ট নামধারী যে রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলি এখন সাধারণভাবে বামপন্থী নামে পরিচিত তারা প্রায় প্রত্যেকটি হলো, এ দেশের পেটিবুর্জোয়া শ্রেণীর সংগঠন। কাজেই সংসদীয় এবং অসংসদীয় দল হিসেবে একভাবে সক্রিয় থাকলেও তাদের পক্ষে দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি পরিবর্তন করে নোতুন শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের কোন প্রশ্ন ওঠে না। বামপন্থী ও কমিউনিস্ট নাম ধারণ করেই এরা বাংলাদেশের বুর্জোয়া রাজনীতির বিষাক্ত বৃত্তের মধ্যে ঘোরপাক খাচ্ছে। কিন্তু এই দুর্বলতা সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত এক ধরনের গ্রাহ্য বামপন্থী শক্তি হিসেবে কিছু মহলে এদের টিকে থাকার কারণ এদের প্রতি শাসক শ্রেণীর সামাজিক খুঁটিস্বরূপ বুদ্ধিজীবীদের সাহায্য সমর্থন। এরা সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন লিখিত মাধ্যমকে এ কাজে ব্যবহার করে। সংবাদপত্রগুলিও সাধারণভাবে শাসক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করতে দাঁড়িয়ে এদেরকেই গ্রাহ্য বামপন্থী ও কমিউনিস্ট শক্তি হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থিত করে।

বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর অন্তর্নিহিত দুর্বলতা এখন এমন অবস্থায় যাতে এর পক্ষে বেশী দিন টিকে থাকা আর সম্ভব নয়। এখনো পর্যন্ত এর টিকে থাকার কারণ দেশীয় ক্ষেত্রে এর শক্তিকে মোকাবেলা করার মত প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক শক্তির অভাব। কিন্তু এই শাসক শ্রেণী জনগণ থেকে এখন আগের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশী বিচ্ছিন্ন এবং এই বিচ্ছিন্নতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে এখনো কোন শক্তিশালী প্রতিরোধ সৃষ্টি না হলেও প্রতিরোধের শর্ত দ্রুত পরিপক্ক হচ্ছে।

শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলির হাতে অর্থ, অস্ত্র ও সমগ্র রাষ্ট্রশক্তি থাকলেও জনগণ আজ এদের শাসন উচ্ছেদের জন্য সম্ভাবনাগতভাবে (potentially) এদের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে আছেন। এইভাবে মুখোমুখী দাঁড়িয়ে থাকা জনগণের আকাংখা ও প্রতিরোধ চেতনা ধারণ করে যারা সংগঠিত হবে তাদের নেতৃত্বেই বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হবেন। জনগণ তখন স্পষ্টভাবে দেখবেন তাঁরা যে পরিবর্তন চান তার নেতৃত্ব দেওয়া কাদের পক্ষে সম্ভব।

শাসক শ্রেণী ও জনগণের দ্বন্দ্ব এখন একটা পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। জনগণ শাসক শ্রেণীর বিরোধী, এদের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের প্রতি চরমভাবে আস্থাহীন। তাঁরা এই শাসক শ্রেণীর মূল খুঁটি সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী। এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য শাসক শ্রেণীর হাত থেকে জনগণের আসল প্রতিনিধিদের দিকে চলে আসার শর্ত তৈরী হয়েছে। শক্তির সমীকরণে (equation of power) বড় ধরনের পরিবর্তন আসন্ন হয়েছে।

জনগণের জীবন এখন শুকনো পাতার মত। এই শুস্ক জনজীবনে এক সামান্য স্ফুলিঙ্গ দাবানল সৃষ্টি করতে পারে।

যে বহির্শক্তি বা সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষত: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ওপর বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী নির্ভরশীল তাদের অনেক উচ্চকণ্ঠ প্রচার, অর্থ ও অস্ত্রের দাপট সত্ত্বেও তারা এখন ঐতিহাসিকভাবে ধ্বংসের পর্যায়ে। এই সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রটির আভ্যন্তরীণ সংকট দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের নিজেদের শিবিরেও এখন বড় রকম দ্বন্দ্ব। সারা দুনিয়ার জনগণ এখন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ও সক্রিয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যে এখানকার শাসক শ্রেণীকে ভিয়েতনামের শাসক শ্রেণীর মত দীর্ঘদিন সাহায্য করতে পারবে এমন অবস্থা তাদের নেই। আভ্যন্তরীণ শক্তির ক্ষয়প্রাপ্ত অবস্থায় এবং বহির্শক্তির অক্ষমতার কারণে এখানকার শাসক শ্রেণী অল্প দিনের মধ্যেই ধ্বংসের দোরগোড়ায় দাঁড়াবে। যেভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সামরিক শক্তির জোরে ইরাক দখল করেছে সেভাবে রাষ্ট্র বিপ্লবের সময় তারা বাংলাদেশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এমন সম্ভাবনা খুব কম। জনগণ এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে প্রতিরোধ করতে এগিয়ে এলে তাদের পক্ষে এই আগ্রাসন একেবারেই অসম্ভব হবে।

কিন্তু সে সম্ভাবনা না থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারের সাথে টিফা (Trade and Investment Forum)-র মত অর্থনৈতিক চুক্তি, জীবাণু যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চুক্তি (২০০৩), হানা (Humanitarian Needs Assesment Agreement) ও পীস কোর চুক্তির মত সামরিক চুক্তি ইত্যাদি একের পর এক সম্পাদন করেই যাচ্ছে। এই সাম্রাজ্যবাদী এবং অধীনতামূলক চুক্তিগুলিতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী কোন রকমে টিকে থাকার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।

ভারতীয় রাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর তার আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে এদেশের সম্পদ নানাভাবে লুণ্ঠন ও হস্তগত করছে এবং এ কারণে এখানে তাদের অনেক রকম অন্তর্ঘাতমূলক অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এদেশের বিপ্লবী পরিস্থিতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা ও সামরিক আগ্রাসন পরিচালনা তাদের পক্ষেও অসম্ভব। ১৯৭১ সালে তারা যে পরিস্থিতিতে এ দেশে ঢুকেছিল সে পরিস্থিতি এবং একটি বিপ্লবী অভ্যুত্থানের পরিস্থিতির মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। কাজেই এ ধরনের কোন প্রচেষ্টা করলে ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে এবং পশ্চিমবঙ্গেও এক উথাল পাতাল অবস্থা সৃষ্টি হয়ে তাদের নিজেদের জন্যই বড়ো রাজনৈতিক বিপদ ডেকে আনবে।

এদিকে সমাজের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের পরিস্থিতির মধ্যে পরিবর্তন ঘটছে দ্রুত। শাসক শ্রেণীর প্রতি জনগণের আস্থা নেই, শাসক শ্রেণী আর আগের কায়দায় শাসন পরিচালনা করতে পারছে না। তাদের পুরো শাসন ব্যবস্থা এখন বিশৃংখলায় জর্জরিত, লন্ডভন্ড।

এই লন্ডভন্ড অবস্থায় জনগণের জীবন হাজার রকমে বিপর্যস্ত হচ্ছে। কিন্তু যাঁরা ধনসম্পদের মালিক তাঁদেরও আজ নিরাপত্তা নেই। তাঁদের জীবন, মান ইজ্জত ও ধনসম্পদ আজ ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। প্রতিদিনই এই আক্রমণের বিস্তার ঘটছে। অদূর ভবিষ্যতেই ডাকাত ও বিপ্লবী পরিবর্তনের পক্ষ শক্তি, এ দুইয়ের মধ্যে কার পক্ষে তাঁরা দাঁড়াবেন এই বিকল্প তাঁদের সামনে এক বাস্তব সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে। বিপ্লবী শক্তির হাতে তাঁদের সম্পত্তি অনেকাংশে বেহাত হবে কিন্তু জীবন, মান ইজ্জত ও সাধারণ জীবন যাপন ব্যবস্থা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু ব্যাপক সামাজিক বিশৃংখলার বিপাকে ডাকাতের হাতে তাঁদের জীবন, মান ইজ্জত ও ধনসম্পদ সবই খোয়া যাবে। কাজেই বাংলাদেশের সম্পন্ন মধ্যবিত্ত ও ধনিক শ্রেণীর একটা অংশকেও এখন থেকেই ভাবতে হবে তাঁরা ডাকাত ও সন্ত্রাসী, না সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী পক্ষ কার সাথে থাকবেন, কার পক্ষ তাঁরা সমর্থন করবেন, কাদের কাতারে দাঁড়াবেন।

এই পরিস্থিতিতে সুনির্দিষ্ট করণীয়

বাংলাদেশের পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে এখন এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যেখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দাবী দাওয়া পেশ করে সামান্য কিছু প্রাপ্তির সম্ভাবনাও আর নেই বললেই চলে। শোষণজীবী প্রতিক্রিয়াশীলদের থেকেও আন্দোলনের মাধ্যমে কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, কারণ তারা উৎপাদন অব্যাহত রাখতে চায়, এর জন্য অনেক রকম সংস্কার এবং আপোষ করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে ধন সম্পদ অর্জনের প্রধান উপায় উৎপাদনের মাধ্যমে শোষণ নয়, অবাধ দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে বেপরোয়া লুন্ঠন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে লুণ্ঠন এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসই এখন বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর মূল বৈশিষ্ট্য।

এ কারণে এই শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের কার্যকর লাইনের সঙ্গে অতীতের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কাজের অনেক পার্থক্য। শোষণজীবী প্রতিক্রিয়াশীল ও লুণ্ঠনজীবী সন্ত্রাসীদের শাসনের চরিত্র ও তাদের শাসন কৌশলের মধ্যে যে দুস্তর পার্থক্য সেটাই এখন স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সংগ্রামের পূর্ববর্তী ধারার অনেক কিছু এখন একেবারে অচল।

লুষ্ঠনজীবী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে পূর্ববর্তী সংগ্রামের ধারার অনেক কিছুকেই পরিবর্তন করে নোতুন পথ ও পদ্ধতিতে এগিয়ে নিতে হবে। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন ধর্মঘটের আন্দোলন, প্রতিবাদ বিক্ষোভের জন্য হরতালের ব্যবহার, কৃষকদের অর্থনৈতিক দাবী দাওয়ার আন্দোলন, মিটিং মিছিলের কর্মসূচী সব কিছুই এখন লুন্ঠনজীবীদের প্রশাসনিক সন্ত্রাসের দ্বারা এমনভাবে আক্রান্ত হচ্ছে যার কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই। তাই পূর্বে যেখানে আন্দোলন প্রধানতঃ নির্বাচনের কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হতো, এখন সেই কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়েই আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শাসক শ্রেণীর দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে শত্রুতামূলক দ্বন্দ্ব বিদ্বেষের কারণে নির্বাচন তদারকীর জন্য যে নির্দলীয় অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা হয়েছে তার অধীনে তিনটি নির্বাচনের পর এখন এই ব্যবস্থাও বর্তমান শাসন কাঠামোর মধ্যে অচল প্রতিপন্ন হচ্ছে। এই সংকট পরবর্তী নির্বাচনের সময় এক ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং সমগ্র নির্বাচন ব্যবস্থাকেই উচ্ছেদের দিকে নিয়ে যাবে। বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীনে যে শর্তে এখন প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন হয় তার চরিত্র কি ধরনের ও এর কার্যকারিতা কতটুকু সেটা ১৯৯১ সাল থেকে একের পর এক সাধারণ নির্বাচনের থেকে দেখা যায়। জাতীয় সংসদ থেকে নিয়ে পৌরসভা পর্যন্ত নির্বাচনে অর্থ ও অস্ত্রের ভূমিকাই প্রধান। এর ফলে যারা নির্বাচিত হয় তারা যাদের ভোটে জয়লাভ করে প্রকৃতপক্ষে তাদের প্রতিনিধিত্ব একেবারেই করে না। এই সব নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদ এবং মন্ত্রীসভার চরিত্র ও কার্যকারিতার দিকে তাকালেই এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। জনগণের স্বার্থ যে এই ধরনের নির্বাচনের মাধ্যমে সামান্য মাত্রাতেও পূর্ণ হওয়া সম্ভব নয় এটা এখন এক প্রমাণিত সত্য। জনগণের স্বার্থ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের সদস্যদের আর্থিক এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা যেভাবে ক্রমাগত বৃদ্ধি করে যাওয়া হচ্ছে সেটা নিকৃষ্ট ধরনের নগ্ন লুটতরাজ ছাড়া আর কি?

এই পরিস্থিতিতে জনগণের গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লুণ্ঠনজীবী সন্ত্রাসীদের শাসন ব্যবস্থাকে উৎখাত করে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া শ্রমজীবী জনগণের সামনে কোন বিকল্প নেই। অতীতে এই অঞ্চলে গণঅভ্যুত্থানের একাধিক গৌরবময় দৃষ্টান্ত আছে। গণঅভ্যুত্থান এদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঐতিহ্য। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ পূর্ববর্তী গণজাগরণ, ১৯৯০ সালের এরশাদ নেতৃত্বাধীন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে নাগরিক গণঅভ্যুত্থান এ সবই হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এক একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় ব্যাপার এই যে, অতীতের এই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে কিছু অধিকার অর্জন ও ক্ষেত্রবিশেষে কিছু রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেও এগুলির নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত বরাবরই থেকেছে জনস্বার্থ বিরোধী শক্তির হাতে। জনগণের আসল প্রতিনিধিদের হাতে, তাঁদের সংগঠিত শক্তির হাতে, এগুলির নেতৃত্ব থাকে নি। বাংলাদেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, শাসক শ্রেণী ও জনগণ যেভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে মুখোমুখী হয়ে এক মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করতে দাঁড়িয়েছেন সেখানে অদূর ভবিষ্যতে নোতুন গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন ঐতিহাসিকভাবে ঘটার শর্ত সৃষ্টি হচ্ছে। এই শর্ত পরিপক্ক করার জন্য আমরা কিভাবে কাজ করবো ও কতখানি সাফল্য অর্জন করবো তার ওপরই এখন নির্ভর করছে বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্য।

এখানে একটি বিষয় জরুরীভাবে বলা দরকার। কারও কারও ধারণা যে, এই মুহূর্তে গণঅভ্যুত্থান ঘটলে বাংলাদেশের বিদ্যমান সমাজের সব থেকে প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় দলগুলি, সন্ত্রাসীদের দল ইত্যাদি আরও শক্তিশালীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করবে এবং জনগণের জীবন এখন থেকে অনেক বেশী মাত্রায় বিপর্যস্ত হবে। কাজেই গণঅভ্যুত্থান বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার লাভের কোন সঠিক পথ নয়। উপরন্তু এর আওয়াজ তুললে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া হবে।

একথা ঠিক যে, এই মুহূর্তে কোন প্রস্তুতি ছাড়াই একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটলে তার পরিণতি এভাবে যে আশঙ্কা করা হচ্ছে তাই হবে। কিন্তু আমরা জনগণের অভ্যুত্থানের কথা বলার অর্থ এই নয় যে, এই মুহূর্তেই আমরা এ ধরনের কিছু ঘটানোর কর্মসূচী উপস্থিত করছি। ঐতিহাসিকভাবে এটা দেখা গেছে যে, গণঅভ্যুত্থান কেউ ঘোষণা দিয়ে ও দিনক্ষণ নির্ধারণ করে ঘটাতে পারে না। এটা আসলে ঘটে পরিস্থিতির মধ্যে কতকগুলি বাস্তব শর্ত সৃষ্টির কারণে। এই শর্তের সব থেকে মৌলিক দিক হলো উৎপাদনের সম্পর্ক এবং উৎপাদনের শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্বের মীমাংসার পথ বন্ধ হতে থাকা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে অসম্ভব হওয়া।

আমাদের এখানেও এর অন্যথা হওয়ার নয়। বাংলাদেশের নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এখানকার সামাজিক ভিত্তিভূমি ও জনচেতনায় এক ধরনের ঐক্যের কারণে অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক নির্যাতনে জর্জরিত জনগণ প্রতিকারের অন্য উপায় না থাকায় গণঅভ্যুত্থানের শক্তিতে পরিণত হোন। এই অভ্যুত্থান এখানকার জনগণের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার একটি ঐতিহ্যিক ধারায় পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে অদূর ভবিষ্যতে, দ্রুত পরিপক্ক হতে থাকা রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গণঅভ্যুত্থান অবশ্যম্ভাবী। একে পরিকল্পনা ও কর্মসূচী অনুযায়ী সৃষ্টি করার এবং এর সাল তারিখ নির্ধারনের ক্ষমতা যেমন কারও নেই, তেমনি এটা ঘটলে একে রোধ করার শক্তিও কারও নেই। কাজেই এক্ষেত্রে একমাত্র কর্তব্য হলো, এই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে এমন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা, জনগণের চেতনার এমন বিকাশ ঘটানো যাতে এই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব এ যাবৎকালের একাধিক গণঅভ্যুত্থানের মত জনগণের শত্রুদের কবলিত না হয়। এর নেতৃত্ব যাতে জনগণের হাতে, সংগ্রামের মাধ্যমে প্রমাণিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে আসে ও সুরক্ষিত হয়।

বর্তমান নির্যাতনমূলক শাসন ব্যবস্থার থেকে মুক্তির জন্য জনগণ গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য চান। কিন্তু ঐক্যের এই আকাংখা সত্ত্বেও জনগণের অনেকের চিন্তার মধ্যে এ ক্ষেত্রে একটি বড়ো বিভ্রান্তি আছে। এই বিভ্রান্তি হলো, জনগণের ঐক্যকে বিদ্যমান কতকগুলি বামপন্থী ও কমিউনিস্ট নামধারী সংগঠন ও দলের ঐক্যের সাথে এক করে দেখা এবং এদের ঐক্য ব্যতীত জনগণের সংগ্রামী ঐক্য সম্ভব নয় এটা মনে করা। প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের সংগঠন ও দলগুলি শাসক শ্রেণীর সাথে নানা সূত্রে সম্পর্কিত

থেকে দীর্ঘদিন ধরে বর্তমান শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে কাজ করছে। এ কারণে এদের বৃহত্তম অংশ বাস্তবত: ঐক্যবদ্ধ অবস্থায় থাকলেও এদের দ্বারা এতদিন গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুই করা সম্ভব হয় নি। কাজেই এদের সাথে ঐক্যের জন্য ঐক্য গঠন করে পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নেই। আমরা ঐক্য বলতে বুঝি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল চেতনাসম্পন্ন এবং সমাজ পরিবর্তনের আকাংখী শ্রমজীবী ও শিক্ষিত জনগণের ঐক্য।

সাম্রাজ্যবাদের সাথে অঙ্গীভূত লুণ্ঠনজীবী সন্ত্রাসী শাসক শ্রেণী এবং সারা দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের ও পর্যায়ের শ্রমিক কৃষক মধ্যবিত্ত শ্রমজীবী জনগণ এখন পরস্পরের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মুখোমুখী হচ্ছে। এই সংগ্রামই হলো আশু ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাস্তবতা। এই পরিস্থিতিতে এদেশের লুণ্ঠনজীবী সন্ত্রাসী শাসক শ্রেণীকে উচ্ছেদ করে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই হলো জনগণের মুক্তির পথ।

আমাদের ইতিহাসের এই পরম সন্ধিক্ষণে এই রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য এক শক্তিশালী আন্দোলন গঠনের উদ্দেশ্যে আমি একটি কনভেনশন আহ্বানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এটা হবে এমন এক আন্দোলন যাতে জনগণের শত শত সংগঠন নিজস্ব স্বাতন্ত্র খর্ব না করেই অংশ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। এই কনভেনশনে বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্য সামনে রেখে আশু কর্মসূচী উপস্থিত করা হবে।

আমি একটি রাজনৈতিক সংগঠন গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের সদস্য। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে কনভেনশনটি আহ্বান করলে এর একটি দলগত চরিত্র দাঁড়াবে এবং এর ফলে অন্যেরা এতে উপস্থিত হতে এবং অংশগ্রহণে উৎসাহিত হবেন না, এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আমাদের সংগঠনের সহকর্মী এবং সংগঠনের বাইরে অবস্থিত সহযোদ্ধা ও বন্ধুদের তাগিদ ও পরামর্শ অনুযায়ী বর্তমান জরুরী পরিস্থিতিতে আমি এই কনভেনশন আহ্বান করতে সম্মত এবং এর জন্য উদ্যোগ গ্রহণে প্রস্তুত হয়েছি।

আমার এই উদ্যোগকে সমর্থন ও সব রকম সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করবার জন্য বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক চেতনা সম্পন্ন দল, সংগঠন, গ্রুপ ও ব্যক্তির প্রতি আমি আহ্বান জানাচ্ছি।

কনভেনশনের জন্য কিভাবে কাজ করবেন

১. কনভেনশনের আহ্বান ব্যাপকভাবে প্রচার করুন। এই আহ্বানের বান্ডিল (৫০ কপি) ১০ টাকায় সংগ্রহ করুন ও বিলি করুন।

২. কনভেনশনের সমর্থনে পত্রিকায় বিবৃতি প্রদান করুন বা আমাদের কাছে পাঠান। গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করুন।

৩. আঞ্চলিকভাবে কনভেনশন প্রচার কমিটি গঠন করুন।

৪. আপনার মতামত ও বক্তব্য চিঠি লিখে বা টেলিফোনে জানান।

সকল প্রকার যোগাযোগ

বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় কনভেনশন আয়োজক কমিটি

৬৮/২ পুরানা পল্টন, ঢাকা ১০০০ (বাসস অফিসের নীচতলা) ফোন: ৯৫৬১৩৩৭

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Must Read

The Political Character of the Penal Code

দণ্ডবিধির রাজনৈতিক চরিত্র

Penal law of ancient society was not the law of crime but law of wrong. -Henry Maine সমাজে অধিকাংশ মানুষ প্রচলিত আইনকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে...